ব্যবহারিক এর মজা !

আমরা আমাদের পাঠ্যবইয়ের অনেক বিষয়ই পড়ার সময় এড়িয়ে যায় ৷ বিশেষ করে ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলো ৷ আমরা অনেকেই ভাবি এগুলোর কোনো প্রয়োজন নেই ৷ কিন্তু এই বিজ্ঞানের ব্যবহারিক বিষয়গুলো দিয়ে যে কত মজা করি যায় তা কিন্তু আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যায় ৷ বিশেষ করে রসায়ন ৷ আমরা বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে রসায়ন পড়ি কিন্তু রসায়নের রস উপভোগ করতে পারি না ৷
আজকে আমি রসায়নের ব্যবহার নিয়ে একটা মজার কাহিনী বলব ৷
আমরা সবাই ” সোডিয়াম ” নামটির সাথে সবাই পরিচিত ৷ আজকে যেই মজার কাহিনী টা উল্লেখ করব তা ওই “সোডিয়াম” কেই কেন্দ্র করে ৷ কাহিনী টা শোনার আগে চলো সোডিয়াম এর সঙ্গে আরেকটু পরিচিত হয়ে নিই ৷
সোডিয়ামের প্রতীক হলো ” Na “, পারমাণবিক সংখ্যা 11 , আদর্শ পারমাণবিক ভর 22.98976928 , মৌলের শ্রেণি ক্ষার ধাতু , ১ নং শ্রেণি এবং ৩ নং পর্যায়ে অবস্থান , দশা কঠিন ,গলণাঙ্ক 370.87 কেলভিন , স্ফুটনাঙ্ক 1156 কেলভিন ৷ এই তথ্যগুলো আমাদের পাঠ্যবইয়েই দেওয়া আছে ৷ একটু ঘাটাঘাটি করলেই তোমরা খুঁজে পাবে ৷ এবার চলো তাহলে সোডিয়াম নিয়ে সেই কাহিনী টা বলা যাক ৷
অনেকদিন পর গ্রামের বাড়িতে পরিবার সহ বেড়াতে গিয়েছিলাম ৷গত বছরের কথা ৷ তখন আমি নবম শ্রেনীতে পড়তাম ৷ গ্রামের বাড়িতে আমার চাচাতো ভাইরা ছিল ৷ একজনের নাম শরিফ ৷ ও হলো বড় কাকার বড় ছেলে ৷ ও আমার সমবয়সী ৷ আমরা একই ক্লাসে পড়ি ৷বড় কাকার ছোট ছেলে জারিফ ৷ ও আমাদের থেকে এক ক্লাস নিচে পড়ে ৷ আর ছিল ছোট কাকার ছেলে সুমন ৷ ও জারিফের সাথে একই ক্লাসে পড়ে ৷ কিন্তু আমাদের দলে এই চার ভাই ছাড়াও আরো কয়েকজন সদস্য ছিল ৷ তারা হলো গ্রামের বাড়িতে আমাদের প্রতিবেশী ৷ ওরাও আমাদের সমবয়সী ৷ এদের মধ্যে একজনের নাম বিশেষ ভাবেই উল্লেখ করতে হয় ৷ ওর নাম শোভন ৷ ও নিজেকে সবচেয়ে বেশি সাহসী  লে দাবি করত ৷ এবং নিজের সাহস নিয়ে একটু বেশিই অহংকারী ছিল৷ এমন একটা ভাব ছিল যেন ওই গ্রামে ওর চেয়ে সাহসী আর কেউ নেই ৷
ওই বার আমরা বার্ষিক পরীক্ষার পর গ্রামে গেছিলাম ৷ শীতের ছুটি কাটাতে ৷ আমাদের তো গ্রামের বাড়ি গেলে খাওয়া ঘুম থাকে না ৷ সারাদিন ঘুরাঘুরি আর খেলাধুলা ৷ আর আমাদের দৈনন্দিন রুটিনের সবচেয়ে মজার অংশ ছিল প্রতিদিন রাত ১২ টায় ভূত এফএম শোনা ৷ ভৌতিক সব কাহিনী ৷ সব বন্ধুরা মিলে একসাথে শুনতাম ৷ মাঝে মাঝে গা শিউরে উঠত ৷ কিন্তু আমরা সবাই  কম বেশি ভয় পেলেও শোভন কখনো ভয় পেত না ৷ একটা আশ্চর্য রকমের সাহসিকতা কাজ করত ওর মধ্যে ৷
একদিন রাতের কথা ৷ ওইদিন অনেক ভয়ঙ্কর একটা কাহিনী শুনাচ্ছিল রেডিও তে ৷আমরা তো শেষমেশ রেডিও টা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম ৷ কিন্তু প্রতিদিনের মতো আজও শোভনের ক্ষেত্রে কোনো ব্যতিক্রম কিছু ঘটে নি ৷ আজও শোভন সামান্যতম ভয় ও পাইনি ৷ আমরা ওকে জিজ্ঞেস করলাম যে ওর কি একটুও ভয় নেই জানে ? ও বলল, নাহ ও কোনো কিছুতেই ভয় পায়না ৷ আর গর্বের সহিত একটা মুচকি হাসি হাসল ৷ আমরা বললাম এমন কিছু একটা তো আছেই যাতে ও ভয় পাবেই ‌৷ কিন্তু ও তা পুরোই অস্বীকার করল ৷আমারও তো নাছড়বান্দা কম না ৷ আমরা বললাম কয়েকদিন মধ্যেই আমরা তোকে ভয় দেখাবো ৷ এটা আমাদের চ্যালেঞ্জ ৷ শোভন ও আমাদের কে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল যেইদিন আমরা ওকে ভয় দেখাতে পারব সেইদিন ও আমাদেরকে খিচুড়ি আর মুরগির মাংস খাওয়াবে ৷ প্রথমে আমাদের চ্যালেঞ্জ বেশি একটা দম না থাকলেও ওর খিচুড়ি আর মাংসের কথা শুনে আমরা পুরো দমে চ্যালেঞ্জ গ্রহন করে নিলাম ‌৷
কিন্তু আমরা এমন কোনো কিছুই ভেবে পাচ্ছিলাম না যেটা দিয়ে ওকে ভয় দেখানো যায় ৷ কিন্তু আমরা চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছিলাম ৷ অনেক চেষ্টা ওর সামনে মাথা তুলে দাড়াতেও পারিনি ৷ আচমকা আওয়াজ করে ভয় দেখানোর চেষ্টা করলাম ৷ সেটাও ব্যার্থ হলো ৷ অদ্ভূত অদ্ভূত শব্দ করলাম , তাও ব্যার্থ হলো ৷ সবসময় আমরা এটা ভাবতেই ব্যাস্ত থাকতাম যে কি করা যায় ‍৷
হঠাৎ করে আমার মাথায় একদিন আমাদের রসায়নের স্যার হাসান স্যারের কথা মনে পড়ল ৷ তিনি সবসময় আমাদের কে রসায়নের রস কিভাবে বের করা যায় তা শিখাতেন ৷ আর এর সাথে সাথে বুদ্ধিও পেয়ে গেলাম ‌৷ আমরা সবাই মিলে আলাপ আলোচনা করলাম ৷ সবাই বলল এই পরিকল্পনা কিছুতেই নষ্ট হবে না ৷ এবার শোভন ভয় পাবেই ‌৷ শুরু হয়ে গেল কাজের প্রস্তুতি ৷ প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহের কাজ ৷ আর ঠিক মতো পরিকল্পনা গঠন করা ৷ যাতে কিছুতেই এবারের পরিকল্পনা ভেস্তে না যায় ৷
২৮ এ ডিসেম্বর ৷ দিনটার কথা আমার আজও মনে আছে ৷ আর মনে থাকবে নাই বা কেন ! যা ঘটনা ঘটাইছিলাম আমরা ‌৷ দিনটি তে প্রচুর শীত পড়েছিল ৷ ওই সময় শৈতপ্রবাহ চলছিল ৷ সেইদিন বিকালে আমরা ক্রিকেট খেলা শেষে বাড়ির পথে আসছি ‌৷
আমি কথাটা শুরু করলাম , জানিস শোভন ‌? শুনেছি শীতের রাতে নাকি ভূত পেত আকাশে চলে আসে ৷ নিজ চোখে নাকি দেখা যায় ওদের ৷ তা আমরা তো কোনোদিন সাহস করে যেতে পারব না ৷ তুই আজ রাতে একটু বেরোস ৷ ঠিক রাত ২ টার সময় ৷ দেখি তোর কেমন সাহস ৷ ও বলল ,  এ আর এমন কি কাজ ৷ কিন্তু সমস্যা তো একটাই এতো শীতে তো জমেই যাব ওতো রাতে ৷ তারপর আমরা অনেক করে ওকে রাজি করিয়েই ছাড়লাম ‌৷ আজকে ওর সাহসিকতার পরীক্ষা ৷
রাতে ঘুমানোর আগেই আমরা সবাই আলোচনা করে রাখলাম ৷ সবাই সবার মতো ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রাখব ৷ সঠিক সময়ে আমরা বাড়ির বাইরে পুকুরের পাশে যে যার মতো অবস্থান নিয়ে নিব ৷ আমার কাছে থাকবে আসল জিনিস ৷ আমার সাথে থাকবে শরিফ ৷ কিন্তু এ বিষয়ে যেন শোভন কিছু না জানতে পারে সে দিকেও সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে ৷ আজ খেলা হবে ৷ বিজ্ঞানের খেলা ৷
রাত দুইটার দিকে শোভন ওর কাজের জন্য কাঁপতে কাঁপতে বেরোচ্ছে ৷ সে ভয়ে কাঁপছে নাকি শীতে কাঁপছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না ৷ ওর আসার আগেই আমরা জায়গা মত এসে উপস্থিত ৷ সবাই সবার মতো লুকিয়ে রয়েছে ৷ শোভন হাটতে হাটতে আসছে ৷ আমার হাতে রয়েছে একটা বোয়েম ৷ ওর ভিতর কেরোসিনের নিচে আসল জিনিস টা রাখা ৷ শোভন যেই পাকুরপাড়ে এসে দাড়ালো , আমি সাথে সাথে একটা কাঠি দিয়ে জিনিস টা বোয়েম থেকে বের করে পুকুরের পানিতে ফেলে দিলাম ৷ তারপর শুরু হলো আসল মজা ৷ আমরা সবাই এইদিকে একটুও খেয়াল না করে সবাই শোভনের দিকে তাকিয়ে রয়েছি ‌৷ শোভন দেখল পানিতে কি একটা হালকা হালকা দেখা যাচ্ছে ৷ দেখতে দেখতে ধপ করে জ্বলে উঠল ‌৷ তারপর সারা পুকুর ছোটাছুটি করছে লাল আগুনের মতো ৷ এইটুকু দেখার পরেই শোভন ঢপাস করে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে পড়ে গেল ৷ আমরা সবাই ধর ধর করে ওকে আমার ঘরে নিয়ে গেলাম ৷ কিছুক্ষণ পর ওর জ্ঞান ফিরল ৷ চোখের সামনে আমাদের দেখে ও মনে একটু স্বস্তি পেল ৷ তারপর আমাদের কে ওর সাথে ঘটে যাওয়া কাহিনী বলল ৷ আমরা প্রথমে মনোযোগ দিয়ে শুনলেও বেশিক্ষণ হাসি ঠেকিয়ে রাখতে পারলাম না ৷ আমরা সবাই একসাথে হেসে দিলাম ৷ তারপর শরীফ ঠাট্টার সুরে বলে উঠল , আমি খুব সাহসী ৷ আমার মতো সাহসী এই গ্রামে আর কেউ নেই ৷ শোভন লজ্জায় আর কোনো কথা বলল না ৷ তখন আমি বললাম আচ্ছা যা হয়েছে হয়েছে এখন সবাই ঘুমা ৷ ওই রাতে শোভন ঘুমাতে পেরেছে কিনা জানি না কিন্তু যতবার ই চোখ মেলেছি , দেখেছি যে শোভন তাকিয়ে আছে ৷ ও সম্ভবত ওই রাতে ঘুমাতে পারে নি
পরদিন সকালে আমরা যখন সবাই বারান্দাই রোদ পোহাতে বসেছি তখন আমরা শোভন কে কাহিনীর আসল রহস্য সম্পর্কে বলি ৷ আসলে ওই ছোট বোয়ামে কেরোসিনের মধ্যে এক টুকরা সোডিয়াম ছিল ৷ এটা কেরোসিনের নিচে রাখার কারণ হচ্ছে সোডিয়াম অত্যন্ত সক্রিয় ধাতু ৷ এটা মুক্ত অবস্থায় থাকলে প্রথমে বায়ুর অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম আক্সাইড তৈরি করে ৷ পরে সেই সোডিয়াম অক্সাইড বায়ুর জলীয় বাষ্পের সাথে বিক্রিয়া করে উৎপন্ন করে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড ৷ পরে সেই সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড বায়ুর কার্বন ডাই অক্সাইড এর সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম কার্বনেট তৈরি করে ৷ যার ফলে আমরা কাঙ্খিত সোডিয়াম ধাতু আর পাইনা ‌৷ এজন্য কাঙ্খিত সোডিয়াম ধাতু পাওয়ার জন্যই এই মোলায়েম কাইদা পালন করা হয়েছে ৷ তারপর আসল কথাই আসি ৷ আমি যখন ওই সোডিয়াম এর টুকরো টা পানিতে ফেলে দেই তখন সেটি শোভনের দেখা আগুনে পরিনত হয় ৷ এর কারন ও খুব স্পষ্ট ৷ সোডিয়াম পানির অপেক্ষা হালকা বলে এটি পানিতে ভাসে ৷ সোডিয়াম এর টুকরো টা আমি যখন পানিতে ফেললাম তখন ওই সোডিয়াম পানির সাথে বিক্রিয়া করে সোডিয়াম হাইড্রোক্সাইড , হাইড্রোজেন গ্যাস এবং প্রচুর পরিমাণে তাপ উৎপন্ন করল ৷ এই তাপের কারণে সোডিয়াম টি আগুনের মতো দেখতে শুরু করল ৷ এবং সারা পুকুরের পানিতে ছুটাছুটি করতে শুরু করল ৷ এটা রসায়নের একটা ম্যাজিক ও বলতে পারো ৷ কিন্তু শোভন এটিকে দেখে পানিতে জ্বলন্ত ভূত ভেবে ভয় পেয়েছিল ৷ তার সাহসিকতার দম্ভ ও সেইদিন নষ্ট হয়ে গেছিল ৷ এবং ও রসায়নের এমন আশ্চর্য পরীক্ষণের কথা জেনে রসায়ন পাঠে আরো উৎসাহিত হয়েছিল ৷ আর তার সাথে সাথে আমাদের খিচুড়ি আর মুরগির মাংস ও পাওনা হয়ে গেছিল ৷
আসলেই বিজ্ঞান এমন একটা জিনিস যেটা আমরা পড়ি কিন্তু গভীরভাবে অনুভব করার চেষ্টা করি না ৷ বিজ্ঞানের এমন হাজার হাজার এক্সপেরিমেন্ট আছে যা সত্যিই অনেক রহস্যজনক এবং মজাদার ও বটে ৷ এগুলো আমাদের পাঠ্যবইয়ে উল্লেখ থাকলেও আমরা এগুলো এড়িয়ে যায় ৷ যদিও এই এক্সপেরিমেন্ট এর কথা আমরা হাসান স্যারের কাছ থেকে শুনেছিলাম ৷ যাইহোক এমন অনেক অনেক রহস্যময় এক্সপেরিমেন্ট আছে বলেই বিজ্ঞান আমার এতো প্রিয় ৷ বিজ্ঞানের এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান না থাকলে বিজ্ঞান পড়া অনেকাংশেই ব্যার্থ বলে আমি মনে করি ৷
By আরিফ ইশতিয়াক শোভন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *