আলোকবিজ্ঞানের জনক : হাসান ইবন হায়সাম

কখনো কি ভেবে দেখেছেন,কোনো বস্তুকে আমরা কীভাবে দেখি?এইযে আপনি আপনার মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখে লেখাটি পড়ছেন,আপনি কি জানেন কীভাবে তা সম্ভব হচ্ছে?
ঠিক এই প্রশ্নগুলোই তাড়া করে বেড়াচ্ছিল এক মুসলিম তরুণ কে।কথায় বলে, “প্রয়োজনই আবিস্কারের জননী”।প্রশ্নগুলোর উত্তর সেই তরুণকে পরিচালিত করে “আলোকবিজ্ঞান” নামক বিজ্ঞানের এক নতুন শাখার জন্ম দিতে।তার অনুসন্ধান, গবেষণা তাকে বিশ্বের ইতিহাসের প্রথম সত্যিকার বিজ্ঞানীর খেতাব এনে দেয়।বলছিলাম হাসান ইবন হায়সামের কথা।এই মুসলিম বিজ্ঞানীর বুদ্ধিমত্তা, গবেষণাকর্ম এতোটাই আধুনিক ছিলে যে তাকে আইন্সটাইনের সাথে তুলনা করা হয়।
Michael Hamilton Morgan বলেন,
“তার কাজের আধুনিকতা এবং সেই সময়ের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কথা বিবেচনা করে হাসান আল হায়সাম কে অবশ্যই আইন্সটাইনের সাথে তুলনা করা চলে” [1]
এই মহান বিজ্ঞানীর জন্ম ৯৬৫ সালে বর্তমান ইরাকের বসরা নগরীতে।ছোটবেলায় মক্তবে ইসলাম শিক্ষা নেয়ার পর তিনি প্রশাসনিক চাকরিতে যোগ দেন।এই সময় নীলনদ নদীভাঙনের অভিশাপে জর্জরিত ছিল। মিশরের শাসক ফাতেমীয় খলিফা আল হাকিম সমস্যা সমাধানের জন্য প্রকৌশলীদের আহবান করতে থাকেন।কিছুটা Over confidence এর সাথেই হায়সাম উক্ত সমস্যা সমাধানে অগ্রসর হন।কিন্তু কাজ শুরু করার পর তিনি বুঝতে পারেন তা অসম্ভব। এদিকে এ কথা খলিফাকে বললে তার রোষে পরার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে।তাই খলিফার হাত থেকে বাচতে তিনি পাগলের অভিনয় শুরু করেন।এসময় তাকে শাস্তিস্বরূপ একটি বাড়িতে আটকে রাখা হয়।১০১১ থেকে ১০২১ এই দশ বছর তিনি বন্দী ছিলেন।এটা তার জীবনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট ছিল। বন্দীজীবনের পুরোটা সময় তিনি কাজে লাগান।এসময় তার দ্বারা যে বিপ্লব সাধিত হয় তা আজও আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে!
একবার তিনি তার ঘরে বসেছিলেন।ঘরটি সম্পূর্ণ অন্ধকার ছিল।হঠাৎ খেয়াল করলেন একটি সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে আলো প্রবেশ করছে এবং বিপরীত দেয়ালে বাহিরের উল্টানো প্রতিবিম্ব গঠন করছে।এই ছোট্ট পর্যবেক্ষণ পরবর্তীতে তাকে টলেমির মত বড় দার্শনিককে চ্যালেঞ্জ করতে সাহায্য করে।
সেসময় “আমরা কীভাবে দেখি” এ সম্পর্কিত দুটি তত্ত্ব ছিল।একটা ছিল “Emission theory” অর্থাৎ আমাদের চোখে থেকে আলো নিঃসৃত হয় বলে আমরা কোনো বস্তুকে দেখতে পাই, টলেমি যেটার সমর্থক ছিলেন।আরেকটা হচ্ছে “Intromission theory” এরিস্টটল যেটাকে সমর্থন করতেন।অর্থাৎ কোনো আলোকীয় বস্তু থেকে নিঃসৃত আলো বস্তুর উপর প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে প্রবেশ করলেই আমরা বস্তুটিকে দেখতে পাই।আল হায়সাম এরিস্টটলের সাথে একমত ছিলেন এবং সর্বপ্রথম এই ধারণাকে প্রমাণ করতে সক্ষম হন।তার সাফল্যের মূল কারণ ছিল, তিনি এরিস্টটলের ধারণা, ইউক্লিডের আলোকরশ্মির গাণিতিক প্রকাশ এবং গ্যালেন এর চোখের নিখুঁত বায়োলজিকাল ব্যাখাকে সমন্বয় করতে পেরেছিলেন।তিনি তার এই মহান কাজের কথা তার “কিতাবুল মানাজির” বা “Book of optics” এ উল্লেখ করেন।
তিনিই পরীক্ষা করে একথা প্রমাণ করেন যে আলো সরলপথে চলে।তিনি তার বইতে নিম্নোক্ত পরীক্ষার কথা লেখেন,
“let an experiment. Take a solid body, make a tiny hole in it then hold it opposite the sun. He will find that light goes through the hole,moving along a straight line” [2]
তার আবিস্কৃত pinhole camera বা camera obscura তাকে আধুনিক ক্যামেরার কাছাকাছি নিয়ে আসে।[3]
আলোকবিজ্ঞানের উপর তার আরও কাজ ছিল।
“কিতাবুল মানাজির” এ তিনি রংধনু, আলোর প্রতিসরণ, আলোর প্রতিফলন, আয়না ইত্যাদি বিষয়ে তার গবেষণার কথা লিখেছেন।
তিনি যে শুধু “আলোকবিজ্ঞান” এর জনক ছিলেন, তা না।তিনিই “পরীক্ষামূলক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি” এর প্রবক্তা।যতদূর জানা যায় তিনিই প্রথম সঠিকভাবে বিজ্ঞানের প্রয়োগ নীতির ব্যবহার করেন। [4]বর্তমানে রজার বেকনকে উক্ত সম্মান দেয়া হলেও হাসান আল হায়সাম তারও কমপক্ষে ২০০ বছর আগে এ ব্যাপারে বলে গেছেন।এখানে একথা বলে রাখা ভালো যে সে সময়ও বিজ্ঞান, দর্শন থেকে পুরোপুরি আলাদা হয়নি।তাই বিজ্ঞানীগণ অনুমানের উপর নির্ভর করেই কোনো বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের স্বীকৃতি দিতেন।আল হায়সাম এ মতের তীব্র বিরোধিতা করতেন এবং পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষামূলক গবেষণার কথা বলতেন।”কিতাবুল মানাজির” এর একটি অনুচ্ছেদে তিনি লিখেছেন,
“আমাদের অবশ্যই স্বতন্ত্র কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর বিষয়ের বৈশিষ্টাবলি, যা সাধারণ দৃষ্টিতে অপরিবর্তনীয়, সুষম, স্পষ্টত প্রকাশ্য এবং সন্দেহাতীত বলে মনে হয়, তা হতে আরোহ অনুমানের ভিত্তিতে প্রাপ্ত তথ্যকে আলাদা করা উচিত।যার উপর ধীরেসুস্থে এবং শৃঙ্খলার সাথে আমাদের আলোচনা এবং অনুসন্ধান চালাতে হবে,সমালোচনা হবে প্রাকৃতিক প্রতিজ্ঞাসমূহ এবং তা হতে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলোর প্রতি – আমাদের তদন্ত এবং পর্যালেচনার উদ্দেশ্য হলো সত্যের প্রতি সুবিচার,কুসংস্কারের অনুসরণ থেকে মুক্তি এবং যা কিছু আমরা বিচার এবং সমালোচনা করবো তাতে এ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে যে আমরা তা সত্যান্বেষণের জন্য করছি,নিজের বা অন্যের তথ্য দ্বারা বিভ্রান্ত হতে নয়”[5]
তিনি আরও বলেন,
“If learning the truth is scientists goal,then he must make himself the enemy of all that he reads!”[6]
বলাই বাহুল্য, তার এই সন্দেহপ্রবণতাই আধুনিক বিজ্ঞানের অন্যতম ভিত্তি।এর জন্যই বিজ্ঞানের সকল থিওরি ক্রমাগত হয় বাতিল হচ্ছে কিংবা মডিফাইড হচ্ছে।
তিনি লেন্স নিয়েও কাজ করেছিলেন।তিনি ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের ক্ষমতার ব্যাপারে জানতেন।তার গবেষণা গ্যালিলিও ও কোপার্নিকান এবং লিউয়েন হুককে সাহায্য করেছিল যথাক্রমে টেলিস্কোপ এবং মাইক্রোস্কোপ নির্মাণে।[7]
আলোকবিজ্ঞানে তার সর্বাধিক অবদান থাকার কারণে বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখায় তার অবদান তূলনামূলক কম আলোচনা করা হয়।তা সত্বেও তিনি যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই বিপ্লব ঘটিয়েছেন বিশেষ করে গণিত এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানে।নিচে সংক্ষিপ্তাকারে তার অন্যান্য কাজের কথা উল্লেখ করা হলো,
১.আলোক সংক্রান্ত কিছু সমস্যা সমাধানে তিনি চতুর্ঘাত সমীকরণের সমাধান বের করেছিলেন যেটা তাকে ইন্টিগ্রেশন (যোগজীকরণ) বা সহজ কথায় আধুনিক ক্যালকুলাসের কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল।
২.তিনিই প্রথম বিজ্ঞানের সাথে গণিত( বিশেষ করে জ্যামিতি) কে সম্পর্কিত করার বিষয়টি সামনে আনেন।তিনি বলেন,
“The knowledge of optics demands a combination of physical & mathematical studies” [8]
এরই ধারাবাহিকতায় আজ গণিতকে “বিজ্ঞানের রানী” বলা হয় কারণ গণিত ছাড়া Scientific explanation বলতে গেলে অসম্ভব।
৩.তিনি ইউক্লীডের পঞ্চম স্বীকার্যের গাণিতিক প্রমাণ বের করেছিলেন।
৪.তিনি গ্র‍্যাভিটি বা মহাকর্ষ বলের কথা অনুমান করেছিলেন।তিনি গ্যালিলিও এবং স্যার আইজাক নিউটনেরও প্রায় ৬০০ বছর আগে ভরের আকর্ষণের কথা লিখেছেন।[9]
৫.বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণের ঘটনা লক্ষ করে তিনি বায়ুমন্ডলের উচ্চতা পরিমাপ করেছিলেন ১৬ কিলোমিটার, যেখানে বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞানীরা নিকট বায়ুমন্ডল “ট্রপোস্ফিয়ার” এর উচ্চতা পরিমাপ করেছেন ১১ কিলোমিটার।[10] অর্থাৎ তার ধারণা অনেকটাই সঠিক ছিল।
৬.তিনি তার প্রবন্ধ “মাকালা ফি দাও আল ক্বমার” এ চাঁদ সম্পর্কে লিখেছেন।চাঁদের আকার সংক্রান্ত যে জটিলতা দেখা যায় তিনি তা সমাধান করে বলেন যে এটা চোখের ভ্রম বা “illusion” ছাড়া আর কিছুই না।
৭.তিনি বিশ্ব মুসলিমদের জন্য গাণিতিকভাবে ক্বিবলার দিক নির্ণয় করেছিলেন।
৮.সেসময়কার বিজ্ঞানীদের উপর টলেমির অসাধারণ প্রভাব ছিল।তারা তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করত।কিন্তু আল হায়সাম শুরু থেকেই এর বিরোধী ছিলেন।তিনি তার এক প্রবন্ধে বলেন,
“শায়েখের উক্তি থেকে এটা স্পষ্ট যে তিনি টলেমির বুলিমাত্রকে বিশ্বাস করে নেন,পরীক্ষণ-পর্যবেক্ষণের উপর নির্ভরতা কিংবা কোনো প্রমাণ ছাড়াই………তবে গণিতজ্ঞরা পূর্ববর্তী বিশেষজ্ঞদের প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বর্ণনায় এভাবে বিশ্বাস করেন না(প্রমাণ বা পরীক্ষণ ছাড়া)”
তিনিই ততকালীন একমাত্র বিজ্ঞানী ছিলেন যিনি টলেমির কাজের উপর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।আলোক সংক্রান্ত টলেমির ভ্রান্ত ধারণা,টলেমির সৌরজগতের ভুল মডেলসহ অন্যান্য বিষয় তিনি তার বই “আল শাকুক আ’লা বাতলামিউস” (টলেমি সম্পর্কে সন্দেহ)তে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করেছেন।
৯.তিনি একথা পরিমাপ করে বলেন যে,গোধূলি তখনই সংঘটিত হয় যখন সূর্য দিগন্ত থেকে ১৯ ডিগ্রি নিচে থাকে।[11]
১০.মানব শারীরতত্ত্ব বা Human Physiology তেও তার অবদান আছে। বস্তু থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে চোখে প্রবিষ্ট হবার পর রেটিনা থেকে কীভাবে মস্তিষ্কে দর্শনানুভূতি জাগায় এ ব্যাপারে তিনিই প্রথম নিখুঁত বায়োলজিকাল ব্যাখা দেন।
দূর্ভাগ্যজনকভাবে এই মহান বিজ্ঞানীর যে পরিমাণ সম্মান পাওয়ার কথা ছিল তা তিনি পাননি।ইউরোপে তিনি Al hazen নামে অর্থাৎ তার বিকৃত নামে পরিচিত। আজকের মুসলিমরাও তার অবদানের ব্যাপারে উদাসীন।অথচ বৃটিশ বিজ্ঞান-ইতিহাসবিদ এইচ.জে.জে.উইন্টার বলেন,
“আর্কিমিডিসের পর ইবন আল হায়সাম পর্যন্ত কোনো প্রকৃত পদার্থবিজ্ঞানীর আবির্ভাব ঘটেনি”
তাছাড়া George Sarton তার “History of Science” বইতে বলেন,
“He, Ibn Al Haytham, was the greatest Muslim physicist & student of Optics of all times.Whether it be in England or far away Persia, all drank from the same fountain.He exerted a great influence on European thought from Bakon to Keplar”
[12]
এভাবে জর্জ সার্টন আধুনিককালের সকল জ্ঞানের উৎস হিসেবে ইবন আল হায়সাম কে দাবি করেন।
বসরায় জন্মগ্রহণ করলেও জীবনের একটা উল্লেখযোগ্য সময় ইবন আল হায়সাম মিশরে অতিবাহিত করেন এবং এখানে ১০৪০ সালে মাত্র ৭৫ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।তার পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে খুব বেশি জানা যায় নি।তবে তিনি একজন ধার্মিক মুসলিম ছিলেন।
এক শ্রেণির কূপমণ্ডূক জ্ঞানের স্বল্পতার জন্য বিজ্ঞান ও ধর্মকে একে অন্যের প্রতিপক্ষ দাড় করায়।চলুন দেখে আসি পৃথিবীর সর্বপ্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ (হয়ত) বিজ্ঞানী এ ব্যাপারে কি বলেন,
“আমি ক্রমাগত সত্য ও জ্ঞানের অনুসন্ধান চালিয়ে গিয়েছি।এটা আমার বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে যে আল্লাহর নৈকট্য ও করুণা পাবার অন্য কোনো পথ নেই জ্ঞান ও সত্যের অনুসন্ধান ব্যতীত”[13]
References:
[১]Lost history:The enduring legacy of Muslim scientists, thinkers & artists.
Page:106
Author:Michael H. Morgan
[২]Lost history:The enduring legacy of Muslim scientists, thinkers & artists.
Page:104
[3]1001 inventions:The enduring legacy of Muslim civilization.
Page:56
Editor:Salim T.S. Al Hassani
Publisher:National geographic.
[4]Lost history:The enduring legacy of Muslim scientists, thinkers & artists.
Page:103
[5]Book of optics.
Page:62
[7]Lost history:The enduring legacy of Muslim scientists, thinkers & artists
Page:105
[8]1001 inventions:The enduring legacy of Muslim civilization.
Page:55
[9]Lost history:The enduring legacy of Muslim scientists, thinkers & artists.
Page:105
[10]1001 inventions:The enduring legacy of Muslim civilization.
Page:55
[11]Lost history:The enduring legacy of Muslim scientists, thinkers & artists.
Page:105
[12]1001 inventions:The enduring legacy of Muslim civilization.
Page:55
By Zahid Hasan

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *