এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স

পৃথিবীর অন্যতম আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি হলো এন্টিবায়োটিক। বিভিন্ন বই-পুস্তকে বা গল্পে স্কটল্যান্ডবাসী চিকিৎসক ও জীবাণুতত্ত্ববিদ আলেকজান্ডার ফ্লেমিং এবং আকস্মিক ঘটনায় তার পেনিসিলিন আবিষ্কার করার কথা শুনেছি। স্ট্যাফাইলোকক্কাস জীবাণু নিয়ে কাজ করতে গিয়ে তিনি এমন এক ধরনের ছত্রাকের সন্ধান পান, যার জীবাণু নাশ করার ক্ষমতা রয়েছে। ছেলেবেলা থেকে আমাদের এই গল্পটা অনেকবার শোনানো হলেও এর ভয়াবহ দিকটার কথা কখনও বলা হয়নি, এমনকি সাধারণ সচেতনতা তৈরির উদ্যোগও নেয়া হয়নি। অথচ ১৯২৮ সালে এন্টিবায়োটিক পেনিসিলিন আবিষ্কারের জন্য ১৯৪৫ সালে যখন ফ্লেমিংকে নোবেল পুরষ্কার দেয়া হয় তখনই তিনি বলেছিলেনঃ “The thoughtless person playing with Penicillin treatment is morally responsible for the death of the men who succumbs to infection with the penicillin-resistant organism.”
অর্থাৎ, “এই এন্টিবায়োটিকের কারণে আজ কোটি কোটি লোক বেঁচে যাবে। অনেক বছর পর এগুলো আর কাজ করবে না। তখন তুচ্ছ কারণে কোটি কোটি লোক মারা যাবে আবার।”
এখন আমাদের একটু ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হবে। নিজেদের অজান্তেই আমরা এন্টিবায়োটিক-পরবর্তী যুগের দিকে এগিয়ে চলছি, যখন এন্টিবায়োটিক আর কাজ করবে না। ফলে নিউমোনিয়া, মেনিনজাইটিস, স্ট্রেপ থ্রোট, টিউবারকুলোসিস, লাইম ডিজিস, পচন কিংবা দেহত্বকে ঘায়ের মতো ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগে আবারও মানুষ প্রাণ হারাতে শুরু করবে। ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত যশোরের সুরুজ মিয়ার সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে জটিল পরিস্থিতিতে পড়েন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্ব্যালয়ের (বিএএমএমইউ) চিকিৎসকেরা। ২৬শে জুন দুর্ঘটনার পরে প্রথমে তার চিকিৎসা হয় বেসরকারি হাসপাতালে। ৫ জুলাই তাকে বিএএমএমইউতে আনা হয়। এখানে পরীক্ষা করে দেখা যায় একটিমাত্র এন্টিবায়োটিক তার শরীরে কাজ করছিলো। সুরুজ মিয়ার মাথাসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ জখম হয়েছিল। বিএএমএমইউতে ভর্তির পর কণ্ঠনালির লালা পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৩টি এন্টিবায়োটিকের নামের পাশে ‘আর’ ( রেজিস্ট্যান্ট) লেখা। শুধু কোলিস্টিন সালফেট নামের এন্টিবায়োটিকের পাশে ‘এস’ (সেনসিটিভ) লেখা। অর্থাৎ তার শরীরে ১৪ ধরনের এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের সুযোগ থাকলেও কোলিস্টিন সালফেট ছাড়া কোনো ওষধ কাজ করছে না। কিন্তু ওষধটি কিডনির ক্ষতি করছিলো। দামও বেশি। তারপর ১১ আগস্ট বিএএমএমইউর আইসিইউতে গিয়ে দেখা যায় সুরুজ মিয়া যে বেডে ছিলেন, সেখানে আছেন সন্ধ্যারাণী। সুরুজ মিয়া ২০ জুলাই মারা গেছেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর ৩১ জুলাই সন্ধ্যারাণীকে এখানে আনা হয়। কাগজপত্রে দেখা যায় সন্ধ্যারাণীর চিকিৎসায় ১৬টি এন্টিবায়োটিক ব্যবহারের সুযোগ ছিল। কিন্তু পরীক্ষায় ১২টিই অকার্যকর শনাক্ত হয়েছে। হাসপাতালে গেলে এমন চিত্র অহরহ দেখা যায়। পরীক্ষা করে দেখা গেল সবগুলো এন্টিবায়োটিকই রেজিস্ট্যান্ট অথবা ২/১টি এন্টিবায়োটিক কিছুটা কাজ করছে যেগুলোর দাম অনেক।
এসব রোগীরা মরে, আর মরার আগে পুরো পরিবারকেও মেরে রেখে যায়। এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্টের বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা না থাকলে আমরা শুধু নিজের বিপদই ডেকে আনবো না, পুরো মানবজাতির অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলব। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্টের কারণে প্রতিবছর ক্যান্সারের চেয়েও বেশি লোক মারা যায়, সারা পৃথিবী জুড়ে বছরে প্রায় ৭ লাখ মানুষ মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সাল নাগাদ এই সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ১০ লাখ। তাছাড়া ২০৫০ সাল নাগাদ এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্টের কারণে সারা বিশ্বব্যাপী অপচয় গিয়ে দাঁড়াবে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে।
এন্টিবায়োটিক কী?
এন্টিবায়োটিক শব্দের উৎপত্তি হচ্ছে গ্রিক শব্দ ‘এন্টি’ ও ‘বায়োস’ থেকে। ‘এন্টি’ অর্থ ‘বিপরীত’ আর ‘বায়োস’ অর্থ ‘প্রাণ’। মূলত এন্টিবায়োটিক জীবিত ব্যাকটেরিয়া তথা অণুজীবের বিপরীতে কাজ করে। এন্টিবায়োটিকের অপর নাম ‘অ্যান্টি মাইক্রোবায়াল ড্রাগ’। এগুলো হলো এমন এক ধরনের ওষধ যা মানুষ ও পশু উভয়ের শরীরেই ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত ইনফেকশনের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এক্ষেত্রে তারা হয় ব্যাকটেরিয়াদের মেরে ফেলে, নয়তো ব্যাকটেরিয়ার দৈহিক বৃদ্ধি ও বংশবিস্তার রোধ করে। ভাইরাসজনিত রোগের জন্য যেমন এন্টিবায়োটিক কার্যকর না, তেমনি এক এন্টিবায়োটিক সব জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করে না।
এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট কি?
বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট হলো এমন একটি অবস্থা যা সংগঠিত হয় যখন কতিপয় ব্যাকটেরিয়া এন্টিবায়োটিকের আক্রমণ থেকে বেঁচে থাকার ক্ষমতা অর্জন করে।
কোনো ব্যাকটেরিয়া কোনো নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে জেনেটিক মিউটেশন ঘটিয়ে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করলে সেই ব্যাকটেরিয়া কলোনিকে ওই এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট বলা হয়। এরা এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে অভিযোজিত হয়ে যায়। ব্যাকটেরিয়া তখন এন্টিবায়োটিক কোর্স চলাকালীন সময়েও নিজেদের স্বাভাবিক গতিতে বেড়ে ওঠে ও বংশবিস্তার করতে পারে। ফলে মানুষের শরীরে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়। আগে যে এন্টিবায়োটিকে রোগ সেরে যেত এখন আর সেই এন্টিবায়োটিকে রোগ সারে না বরং ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে। এসব রোগাক্রান্ত মানুষ বা পশু অন্য কারো উপস্থিতিতে হাঁচি বা কাশি প্রভৃতির মাধ্যমে তাদের শরীরের অভ্যন্তরীণ এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া অন্যদের মাঝেও ছড়িয়ে দেয় এবং তারাও দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়। সাধারণত ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া কিংবা নিয়ম না মেনে এন্টিবায়োটিক খেলে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়। এন্টিবায়োটিকের ভুল ও যথেচ্ছা ব্যবহারের ফলে টিকে থাকার তাগিদে ব্যাকটেরিয়াগুলো নিজেদের মধ্যে জেনেটিক মিউটেশন ঘটিয়ে ফেলতে পারে এবং গঠনগত বা কাজে পরিবর্তন এনে সেই এন্টিবায়োটিককে অকার্যকর করে ফেলতে পারে। অনেক রোগীই এন্টিবায়োটিক কোর্স সম্পন্ন করে না। একজনকে হয়তো সাত দিনের এন্টিবায়োটিক কোর্স দেয়া হলো। কিন্তু সে তিনদিন খেয়ে সুস্থবোধ করার কারণে আর ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজনীয়তা মনে করলেন না। এক্ষেত্রে ব্যক্তির শরীরের অধিকাংশ ব্যাকটেরিয়া মারা গেছে কিন্তু সামান্য কিছু অংশ ব্যাকটেরিয়া টিকে রয়েছে। তিনি যদি পুরো কোর্স সম্পন্ন করেন তাহলে অবশিষ্ট ব্যাকটেরিয়া মারা যাবে। আর যদি না করেন তাহলে অবশিষ্ট ব্যাকটেরিয়াগুলো বহাল তবিয়তে থাকবে এবং পুরো কোর্স সম্পন্ন করা হয়নি বলে এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতিতে অভিযোজনের কৌশল রপ্ত করে ফেলেছে। তাই ভবিষ্যতে তারা বংশবিস্তারের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে রোগাক্রান্ত করে তুলবে। কিন্তু এবার আর আগের এন্টিবায়োটিক ওষধ ব্যবহারের পরও ওই ব্যক্তির রোগমুক্তি ঘটবে না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধের জন্য পৃথিবীর প্রতিটি দেশের সরকার, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগী-স্বজনসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে এগিয়ে আসতে আহ্বান করেছে। কেননা বিপর্যয় সৃষ্টিকারী এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ঠেকানো না গেলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মানবসভ্যতাকে চরম মূল্য দিতে হবে। ‘অ্যান্টি মাইক্রোবায়াল রেজিস্ট্যান্সঃ গ্লোবাল রিপোর্ট অন সার্ভেইলেন্স’ (জীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জনঃ কড়া নজরদারির ওপর বিশ্ব প্রতিবেদন) শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় অসংখ্য সংক্রামক রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু বেশিরভাগ এন্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে ফেলেছে। কয়েকটি গবেষণা থেকে জানা যায় গনেরিয়া চিকিৎসার শেষ অবলম্বন হিসেবে পরিচিত তৃতীয় প্রজন্মের সেফালোস্পোরিন গ্রুপের ওষুধগুলো এখন অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, কানাডা, ফ্রান্স, নরওয়ে, জাপান, স্লোভেনিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, সুইডেন, এবং যুক্তরাজ্যের গনেরিয়া আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সারা বিশ্বে দশ লাখ মানুষ গনেরিয়ায় আক্রান্ত হয়। টাইফয়েড চিকিৎসায় প্রথম সারির তিনটি এন্টিবায়োটিক বাংলাদেশে ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। শ্বাসতন্ত্রের কিছু রোগে অ্যাজিপ্রোমাইসিস (২৭%), সিপ্রোফ্লক্সসিন (৩২%), সেফট্রায়াপ্রোনসহ (৫৬%) ১৫ টি এন্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন গবেষণার উপাত্ত উদ্ধৃত করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাইপেরাসিলিন নামের এন্টিবায়োটিক ১০০ শতাংশ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অ্যামোক্সোসিলিন ৮৯ ও কোট্রিমোক্সাজোল ৮১ শতাংশ ক্ষেত্রে অকার্যকর। ২০১৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (BSMMU) ICU তে মারা যাওয়া ৮০ শতাংশ রোগীর শরীরে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল।
দেশের প্রায় দুই লাখ ওষুধের দোকান থেকে যে কেউ ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই এন্টিবায়োটিক কিনতে পারেন।  অসংখ্য চিকিৎসক সামান্য অসুখে এন্টিবায়োটিক দেন। প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে বিনামূল্যে তিন ধরনের এন্টিবায়োটিক দেয়া হয়। এছাড়াও ব্যবস্থাপত্রে লেখা এন্টিবায়োটিক কেনা ও ব্যবহারের সময় নানা ভুল হয়। এই কারণেও এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স তৈরি হচ্ছে। এখন সকলকে সোচ্চার হতে হবে। কিছু বিষয়ে আমাদের নিজেদের সচেতন হতে হবে এবং অন্যদের সচেতন করতে হবে। যেমনঃ ডাক্তারের নির্দেশনা ছাড়া কোনো ধরনের এন্টিবায়োটিক বা ওষধ সেবন না করা, এন্টিবায়োটিক কোর্স অবশ্যই কমপ্লিট করা, এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার এবং রেজিস্ট্যান্স সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে উদ্যোগ গ্রহন করা। তা না হলে এন্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স থেকে মহাবিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে।
ছবি সংগ্রহঃইন্টারনেট।
By Md. Naimul Islam Meem

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *