বিষমবাহু

১। আলোর জালের মত হালকা কিছু ভাসতে শুরু করে আমার চোখের সামনে। ক্রমেই সে জাল বৃদ্ধি পেয়ে পরতের মত হয়ে যায় আর একটা সময় আমার চোখ খুলে যায়। ঘরের খোলা জানালা দিয়ে আলো পড়েছিলো আমার চোখে। জানালা দিয়ে বাতাস আসছে আর সেই বাতাসে পর্দা পানির মত থৈ থৈ করছে। আমি বিছানায় শুয়ে আছি। আবার, ঘরটাও কেমন যেন নীরব। মনে হচ্ছে এক লম্বা ঘুম দিয়ে উঠলাম সবে মাত্র।

শরীরের আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠতেই দেখি একটি মেয়ে আমার পাশে শুয়ে আছে। মনে পড়লো সে তো আমার স্ত্রী, তন্দ্রা। সবসময় গুটিসুটি মেরে চুপ করে শুয়ে থাকে। খুব একটা নড়েচড়েও না। অনেকে ঘুমালে ঘড়ির কাটার মত চারদিকে ঘুরে, কিন্তু তন্দ্রা সেক্ষেত্রে খুব শান্ত।

বালিশে ডুবে থাকা এই চাঁদমুখ, সেই সাথে গালে লেগে থাকা কিছু চুল থেকে চোখ ফেরানো প্রায় অসম্ভব ছিলো আমার পক্ষে। এই নারীর প্রেমে আমি আমার কলেজ জীবন পাড় করেছি, পাড় করে এসেছি এই পর্যন্ত, আর পাড় করে যেতে চাই আজীবন। সে আমার প্রথম ও একমাত্র প্রেম।

আমি মাথায় হাত রেখে হেলান দিয়ে শুয়ে আছি আর তাকে দেখছি অপলক। খুব সম্ভবত এখন সকাল, আবার বিকেলও হতে পারে। কিন্তু সেদিকে আমার খেয়াল করার ইচ্ছেও নেই কারন আমার মন তখন তন্দ্রার দিকে, শুধু ওর দিকে।

আমি তাকিয়ে থাকা অবস্থায় তন্দ্রার চোখ খুলে যায়। হঠাৎ করেই খুলেছে চোখ। এভাবে সাধারণত চোখ খুলে না মানুষের। মনে হচ্ছিলো যেনো ঘুমের ঘোরে কিছু মনে পড়েছে, কোনো কাজ করতে ভুলে গেছে, তাই দ্রুত চোখ খুলেছে। আমি ওর কাছে এগিয়ে গেলে ও হন্তদন্ত করে উঠে বসলো। আমিও ওর সাথে উঠে বসলাম। ওর ওঠার ধরন দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেলাম কারন অস্বাভাবিক ছিলো সেটা। ভাবলাম কিছু হয়েছে বোধহয়।

কিন্তু তন্দ্রা আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ হা করে চিৎকার দিয়ে ওঠে। সেই চিৎকারের সাথে ওর চোখ, নাক, মুখ দিয়ে অঝোরে রক্ত পড়তে শুরু হয়। আমি এই অবস্থায় ভয় পেয়ে হাত দিয়ে রক্ত বন্ধ করতে যাই আর তখনি একটা শব্দ হয়ে ওর মাথা আমার হাতের মাঝে ফেটে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আমি তখনো বুঝে উঠতে পারিনি যে কি হয়েছে এই মাত্র। তবে, যতক্ষনে আমি বুঝতে পারি ততক্ষনে রক্ত ও খুলির ছিটেয় মাখামাখি সারা ঘর।

আমার গায়ে আমার স্ত্রীর গরম রক্ত আর তার মাথাবিহীন নিথর দেহ বসে আছে আমার সামনে। মনে হচ্ছিলো যেন তন্দ্রার চিৎকারের প্রতিধ্বনি এখনো ঘরের কোনো কোণায় কোণায় বাড়ি খাচ্ছে আর আমি শুনতে পাচ্ছি তা। তন্দ্রা ঘুম থেকে উঠে এভাবে চিৎকার করলো কেনো? সপ্ন দেখে হয়েছে এরকম? কিন্তু এতে তন্দ্রার মাথা ফেটে যাবে কেনো? তন্দ্রাকে কি জিজ্ঞেস করবো একবার? কিন্তু ও শুনবে কি করে? বা শুনলেও বলবে কি করে? ওর মুখ যে আমার গায়ে ছিটে আছে এখন। তাহলে কি তন্দ্রা আর বেঁচে নেই? কিভাবে এত দ্রুত সব হয়ে গেলো?

আমার মাথায় কথাগুলো ঘুরতে ঘুরতে এক পর্যায়ে আমি চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করলাম। মনে হলো শরীর ঢলে পড়ে যাচ্ছে আমার। আবার, কিছুটা শান্তিও লাগছিলো কেনো যেনো। অনেকক্ষণ জোর করে ঘুম আটকে রেখে তারপর ঘুমাতে পারলে যেরকম শান্তি লাগে ঠিক সেরকম। একটা পর্যায়ে আমার শরীর নিচে পড়ে গেলো। আমি কি আসলেই ঘুমিয়ে গেলাম? তাও আবার এরকম সময়ে?

২। আমার চোখের সামনে লাল পর্দার মত কিছু একটা আছে বুঝতে পারলাম। সেই পর্দা হালকা খুলে গেলে তীব্র কিছু দপদপ করতে দেখলাম। এরপর ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ পর্দা খুললে চোখের সামনে আগুন জ্বলতে দেখি আমি। আগুনের আলো চোখের পাতায় লেগে লাল দেখাচ্ছিলো এতক্ষন।

আমায় চোখ খুলতে দেখে কেও একজন আমার মাথায় হাত দিয়ে বলে, ‘ঘুম ভেঙেছে তোমার?’

আমার মাথা ভার হয়ে আছে তাই ঘুরাতে কষ্ট হচ্ছিলো। তারপরেও মাথা ঘুড়িয়ে দেখি আমার স্ত্রী তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি তার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছি। আগুনের আলোয় তার চেহারা কমলা বর্ণের দেখাচ্ছে।

আকাশ কালো ও তাঁরায় ভরা ছিলো। রাতের বেলা আগুন জ্বালিয়ে এ কোথায় বসেছি আমরা? দেখার জন্য পাশে মাথা ঘুরাতেই আগুনের অপর প্রান্তে একজন বয়স্ক লোক ও মহিলাকে বসে থাকতে দেখি। তাদের কোলে দুটি ছেলে মেয়েও আছে। তাঁরা খুব ছোট। পাঁচ থেকে সাত বছর বয়স হবে বড়জোর। কিন্তু এরা কারা? তখন মনে পড়লো সেই লোকটি হচ্ছে আমার বাবা ও মহিলাটি আমার মা। আর তাদের কোলে আমার ছেলে মাশু ও আমার মেয়ে ফিহা। তাঁরা চারজন খুব হাসাহাসি করছিলো। মাশু আমার বাবার আঙ্গুল ধরে কিছু একটা খেলছিলো ও ফিহা আমার মায়ের কোলে বসে গল্প শুনে হাসছিলো। বাবার হাতে আমার ছেলের হাত দেখে মনে হচ্ছিলো আমি ছোটবেলায় ফিরে গিয়েছি। আবার, মা ও ফিহার মুখে হাসি দেখে মনে হচ্ছিলো এর চেয়ে সুন্দর কিছু হতে পারে না।

চারিদিকে অন্ধকার আর মাঝে আগুন। আগুনের কারনে কিছুদূর অবধি ঝাপসা দেখা গেলেও বাকিটুকু দুঃসাধ্য ছিলো। এরকম অবস্থায় তন্দ্রা আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে খুব ধীরে জিজ্ঞাসা করে আমায়, ‘কে তুমি?’

তন্দ্রার এধরনের প্রশ্নে আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হই। তবে তন্দ্রার প্রশ্ন শুনে আমি নিজেও তখন মনে করতে পারিনা যে কে আমি। আমার নাম বা কাজ কিছুই মনে করতে পারছি না। তন্দ্রা তখন আবার জিজ্ঞাসা করে আমায়, ‘তুমি কি কিছু মনে করতে পারছো?’

আমি তন্দ্রার দিকে আবার ঘুরে তাকালে দেখতে পাই সে হাসতে হাসতে কথাগুলো বলছে। এধরনের কথা হেসে বলার কি হলো? আমি আরো বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম। কিন্তু মুহূর্তেই সেই হাসি যেন আতংকে পরিণত হয়ে গেলো। তন্দ্রা সামনে মাথা তুলে জোরে চিৎকার করে ওঠে। তার চিৎকারে আমি উঠে বসি আর দেখতে পাই আমার বাবা-মা আমার দুই ছেলে মেয়েকে কোথাও টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে তন্দ্রা আমাকে রেখে তাদের পেছনে ছুটতে শুরু করলো। আর, এই অবস্থায় আমাকেও ছুটতে হলো তাদের সাথে। কিন্তু আমি যতক্ষনে অন্ধকারে তাদের ধরতে পারলাম ততক্ষনে কোথায় যেন পানির শব্দ শুনতে পেলাম। তারপর আরো সামনে যেতেই দেখলাম তন্দ্রা অনবরত চিৎকার করে পানিতে কি যেন খুজছে। আর পুকুর পাড়ে বাবা-মা চুপ করে দাড়িয়ে আছে, প্রানহীন চোখে তাকিয়ে আছে তন্দ্রার দিকে। কিন্তু এক মিনিট! মাশু ফিহা কোথায়? আমি তন্দ্রার দিকে তাকিয়েই বুঝতে পারলাম তাঁরা দুজন কোথায় আর সাথে সাথে ঝাপ দিলাম পানিতে। তন্দ্রাকে পাশ কাটিয়ে আমি আরও গভীরে খুজতে শুরু করলাম কারন ওরা কেও সাঁতার জানে না। কাজেই, ভেসে থাকা কষ্টসাধ্য ওদের পক্ষে।

আমি জানি না এই পুকুর কোথায়, বা কত গভীর অথবা কত বড়। কিন্তু পাগলের মত খুজছি আমি ওদের। খোজার সময় বারবার চোখে ফিহার হাসি ও মাশুর আঙ্গুল গুলো ভাসছিলো। তারপর প্রায় মিনিট দশেক খোজা শেষে আমি তন্দ্রার দিকে তাকাই দেখার জন্য যে ওর কোনো সাড়া শব্দ নেই কেন। তাকিয়ে দেখি ও চুপ করে পানি থেকে উঠে যাচ্ছে। এরপর পাড়ে পৌঁছে ও বাবা-মায়ের হাত ধরে কোথাও টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাদের। এমন দৃশ্য দেখে তন্দ্রাকে কয়েকবার ডাক দিলেও তন্দ্রা শুনতে পায় না। তারপর আমি দ্রুত সাঁতার কাটতে শুরু করি। এক পর্যায়ে পাড়ে এসে পৌছাই। তারপর ভালোমত দেখার চেষ্টা করি ওরা কোথায় গেলো।  একটু স্মাওনে এগিয়ে যেতেই দেখি আগুনের কাছে কেও দাড়িয়ে আছে। তাই আমি সেদিকে ছুটতে শুরু করলাম।

যাওয়ার পথে কয়েকবার তন্দ্রার নাম ধরে চিৎকার করলেও কোনো সাড়াশব্দ পাই না। তাই, আমি আমার গতি বাড়িয়ে দেই। কিন্তু আগুনের যতই কাছে পৌঁছাই ততই দেখি কেও একজন এদিকে এগিয়ে আসছে। এরপর হঠাৎ করেই আগুন যেন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। আমি দৌড়ের গতি আরো বাড়িয়ে দিলে দেখি তন্দ্রা আসছে এদিকে। এরপর আমরা কাছাকাছি এলে তন্দ্রা আমার দিকে না তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে পেছনে চলে যায়।

আমি ওর হাত টেনে ধরলে ও আমায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। আমি নিচে পড়ে যাই। তবে ব্যথা পাই না। নিচে পড়া অবস্থায় তাকিয়ে দেখি তন্দ্রা পানির দিকে যাচ্ছে। তাহলে বাবা-মা কোথায় গেলো? এই খোজে আমি যখন আগুনের দিকে তাকাই, দেখি দুটো বয়স্ক শরীর দাউ দাউ করে পুড়ছে।

আমি থ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এ কি করলো তন্দ্রা? কি হচ্ছে এসব? এত সহজে কিভাবে সব হয়ে যায়? আমার কি এখন সেই শরীর দুটো আগুন থেকে বের করে আনা উচিত? নাকি যা হয়েছে হয়েছে ভেবে পুড়ে ছাই হতে দেয়া উচিত? কিন্তু একসাথে এতকিছু কেনো হচ্ছে? কত সুন্দর একটা সময় চলছিলো। সবাই কি পাগল হয়ে গেছে? বাবা-মা মাশু ফিহাকে পানিতে… আবার এখন তন্দ্রা বাবা-মা কে… তন্দ্রা? তন্দ্রা পানির দিকে গেলো কেনো? কি করবো এখন আমি?

আমি ঘোর কাটিয়ে উঠলাম। আগুনের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে মনে হলো ছুটে গিয়ে বের করে আনি তাদের। হয়তো এখনো বেঁচে আছে তাঁরা। কিন্তু কি বুঝে যেনো পেছনে দৌড়াতে শুরু করলাম আমি। সামনে সব অন্ধকার তবে ঘোর অন্ধকারেও কিছু বিচ্ছিন্ন আলো চোখে এসে পড়ে যার ফলে হালকা দেখতে পাই আমরা। ঠিক তেমনটাই দেখছিলাম আমিও। ধূসর অন্ধকার। কিন্তু কিছুদূর যেতেই আমি সামনে কাওকে ঝুলে থাকতে দেখলাম। আরও কাছে চলে গেলাম দেখার জন্য। এরপর একদম তার নিচে চলে এলে ভালো মত লক্ষ্য করে তন্দ্রার জামা দেখতে পেলাম তার গায়ে। আমার ভেতরটা আঁতকে উঠলো সেটা দেখে। কিন্তু আমি কিছুই স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না। তাই আমি আবারো আগুনের দিকে ছুটে গেলাম একটা কাঠ নিয়ে আসতে যেন আলো দিয়ে দেখতে পারি। আসা যাওয়ার পথে বারবার নিজেকে বলছিলাম ওটা যেন তন্দ্রা না হয়। ওটা যেন অন্য কেও হয়।

এরপর যখন নিচে আগুন নিয়ে পৌঁছে গেলাম, ওপরে তাকিয়ে দেখি গাছের সাথে একটা ফাঁসির দড়ি ঝোলানো। আর সেই দড়ির ফাঁসে তন্দ্রার গলা। তন্দ্রা ঝুলে আছে সেই দড়ি গলায় দিয়ে। এসব দেখে আমার মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো। আমি অজান্তেই হাতের আগুন ফেলে দিয়ে নিচ থেকে বারবার লাফিয়ে তন্দ্রাকে ধরার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না কোনোমতেই। আমি বারবার লাফের উচ্চতা বাড়াচ্ছি আর তন্দ্রাও যেন আমার চেয়ে আরো দূরে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এত চেষ্টার পরেও আমি পারলাম না ওকে নামাতে।

আমি মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। আমি আর তাকাতেও পাড়ছি না ওপরে। এখন তন্দ্রাও চলে গেলো একই রাতে। প্রথমে ওরা দুজন, তারপর বাবা-মা আর এখন তন্দ্রা? এটা কি কোনো রকম ভ্রম? নাকি আসলেই এরকম হচ্ছে? এটা কি সত্যি নাকি কল্পনা? এটা কি সপ্ন? নাকি বাস্তবতা? সবাই একসাথে চলে গেলো কেন? কি হচ্ছে এসব? চারদিক এতো নীরব কেনো? এসবের পর যেন নীরবতা আরো বেড়ে গেছে। এরপর কি আমার পালা? আমিও কি চলে যাবো সবার মত?

এসব ভাবতে ভাবতে আমি কখন যেনো মাটিতে শরীর ছেড়ে দিলাম। আমার চোখ ছোট হয়ে আসলো। মনে হচ্ছে আমি আবারো ঘুমিয়ে পড়বো। একরকম শান্তি ছড়িয়ে গেলো আমার শরীরে, ঘুমানোর শান্তি। আমি নিস্তেজ হয়ে কোথায় যেন হারিয়ে গেলাম ধীরে ধীরে।

৩। আমার চোখের সামনে অন্ধকার, তবে হাসির শব্দ শুনতে পাই আমি। কেও কথা বলছে আর হাসছে। তবে, একজন মানুষ না বরং কয়েকজন মিলে কথা বলছে এরকম। আমি চোখের পাতা আস্তে খুলতে শুরু করি। কয়েকজন মানুষকে দাড়িয়ে থাকতে দেখি আমার সামনে। তারপর কয়েকবার পলক ফেলে তাকালে দেখি কিছু ছেলে দাড়িয়ে নিজেদের মাঝে হাসাহাসি করছে।

মনে পড়লো এরা আমার কলেজের বন্ধু। আমি চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম আমি আমার কলেজে দাড়িয়ে আছি। আশেপাশে কলেজের ছেলেমেয়ে আর সামনে আমার কলেজ ভবন। পরিস্কার আকাশ ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ। তখন এত শব্দের মাঝে হঠাৎ একটি গলা শুনে আমি নিজের অজান্তেই মাথা ঘুরালাম পাশে। দু চারজন ছেলে এদিকে আসছে আর বলছে, ‘রবিন? কিরে কখন এলি?’

রবিন? কে রবিন? আমার মাথায় নামটা ঘুরতে শুরু করলে এক পর্যায়ে মনে পড়লো আমার নিজের নাম এটা। এরপর তাঁরা আবার বললো, ‘চল ক্যাফে তে গিয়ে বসি। ক্লাস শুরু হওয়ার আগে কিছু খাওয়া দরকার।‘

এটা বলে ওরা সামনে চলতে শুরু করলো আর আমিও তাদের পিছু নিলাম। কিন্তু যখন আমরা মাঠের ঠিক মাঝে তখন হঠাৎ কলেজ ভবন থেকে ধোঁয়া বেরুতে শুরু হলো। ধীরে ধীরে সেই ধোঁয়া প্রকাণ্ড হয়ে আকাশে ভাসতে শুরু করলো। আকাশ যেন পুরো দখলে নিয়ে নিয়েছে এই ধোঁয়া। কালো রঙের বিশাল ধোঁয়া।

সবাই এই ধোঁয়া দেখে চিৎকার করছে আর ছোটাছোটি করছে। চারপাশে অনেক শব্দ আর তাড়াহুড়ো। এরই মাঝে হঠাৎ সবকিছু কেমন যেন একদম নীরব হয়ে গেলো। খুব বেশিই চুপ। কিভাবে হলো? এরকম হঠাৎ শব্দ গায়েব হয়ে যায় কিভাবে? কোনো বড় বিপদ হবে বুঝি?

ঠিক তখনি কলেজ ভবনে বেশ বড় শব্দ করে বিস্ফোরণ হয়। চারপাশে আগুন ও ভবনের ভাঙা অংশ ছড়িয়ে পড়ে। যেনো কোনো উল্কা পিন্ড আঘাত করেছে এখনি। যে যার প্রাণ নিয়ে পালাচ্ছে এখান থেকে। দরকারে একজন আরেকজনের ওপর ঝাপিয়ে তাকে ফেলে রেখে পালাচ্ছে। তবে, এরপর যা হলো তা বিশ্বাস করাও কষ্ট। এর আগে কখনো দেখেছি কিনা জানি না। এক অলৌকিক ঘটনা যেন।

যারা ছুটে পালাচ্ছিলো ও যারা এখনো মাঠে, সবার গায়েই একে একে নিজ থেকেই আগুন ধরতে শুরু হলো। কোনো উৎস নেই, কোনো ফুলকি নেই, কোনো কারন নেই। যেন আগুন উৎপন্ন হচ্ছিলো তাদের শরীর থেকে। আপনা আপনিই এভাবে আগুন লাগে কি করে? কি হচ্ছে এসব? হঠাৎ আমার মাথা ভারী হয়ে যায় আর মাথাব্যথা শুরু হয়।

এরপর আমি ভারসাম্য হারিয়ে যখন মাটিতে পড়ে যাই, কেও একজন এসে আমায় ধরে বসে। ভালো মত তাকালে বুঝতে পারি তন্দ্রা ধরেছে আমায়। তন্দ্রা বারবার কি যেন বলছিলো, কিন্তু আমি শুনতে পাচ্ছিলাম না। শুধু ওর মুখ নাড়ানো আর চেহারায় থাকা ভয় বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু ঝাপসা চোখে যখন তন্দ্রার দিকে তাকিয়ে ছিলাম, দেখতে পাই ওর শরীরেও হঠাৎ আগুন জ্বলে উঠলো আর ও আমায় ফেলে চিৎকার আগুন দমানোর চেষ্টা করতে লাগলো।

তবে আমার কিছুই করার ছিলো না। কারন তার আগেই আমার চোখ বন্ধ হয়ে যায় আর আমি হারিয়ে যাই অন্ধকারে। আবার আগের মত ঘুমিয়ে পড়ি এরকম সময়ে। চলে যাই কোনো অজানা এক অতল গহ্বরে। যার কারন বা অর্থ কিছুই আমার জানা নেই।

৪। কারো ডাক শুনে আমি জ্ঞান ফিরে পেলাম। চোখের সামনে কেমন যেন নীল ও সবুজ আলো দেখতে পাই। আর সেই আলোর সামনে দুটো শরীর দাড়িয়ে বারবার মাথা নিচু করে কি যেন করছে বুঝতে পারি।

তারপর ভালোমত তাকালে দেখি সাদা পোশাকে কেও একজন দাড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার পাশে একজন চিকন মত লোক হাতে একটা ডিভাইস নিয়ে দাড়িয়ে আছে। সেও আমায় দেখছে।

আমায় চোখ খুলতে দেখে সাদা পোশাকের লোকটি জিজ্ঞাসা করলো, ‘কে তুমি? কি নাম তোমার?’

আমি কোনো উত্তর দিলাম না। অথবা এভাবেও বলা যায়, আমি উত্তর দিতে পারলাম না। কারন আমি জানি না।

এরপর সে আবার জিজ্ঞাসা করলো, ‘তুমি কেমন বোধ করছো?’

ততক্ষনে চোখে আলো সহ্য হয়ে এলে আমি উত্তর দিলাম, ‘খুব একটা ভালো না।‘

‘চিন্তার কারন নেই। আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার।‘

তার কথা শুনে আমি বিভ্রান্ত হলাম কিছুটা। বাঁচিয়ে রাখার মানে? আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘বাঁচিয়ে রাখা বলতে কি বুঝাচ্ছেন আপনি?’

সে এক পা পিছিয়ে পাশের লোকটির দিকে তাকিয়ে বললো, ‘বিষম? তুমি বি-৪১৬ কে কাস্টোমাইজ করো এখন। আমি পরেরজনের কাছে যাচ্ছি।‘

‘ওকে প্রোফেসর।‘

আমি তাদের কথা শুনে বিষমকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এটা কোন জায়গা? আমি কোথায় এখন?’

সে ডিভাইসটি হাতে নিয়ে কিছু একটা করতে করতে উত্তর দিলো, ‘ইউনিটি ল্যাবে। এখানে সব রোবট, সাইবর্গ, এনড্রয়েড তৈরি করা হয়।‘

‘ইউনিটি ল্যাব? কোথায় এটা? আর, আমি এখানে কেনো?’

‘ক্লাসিফাইড ইনফরমেশন। বলার অনুমতি নেই।‘

আমি তখন শরীর নাড়াতে গিয়ে নিচের দিকে তাকাই। দেখতে পাই আমার মাথার সাথে কিছু তার লাগানো এবং আমার শরীরের জায়গায় একটা লোহার শরীর।

আমি এসব দেখে ভয় পেয়ে বল উঠি, ‘আমার গায়ে এসব কি! আর আমি এখানে কিভাবে এলাম? আমায় বেধে রেখেছো কেনো! কি হচ্ছে এসব!’

বিষম কাজ করতে করতে উত্তর দিলো, ‘যুদ্ধের পর তোমার শরীর উদ্ধার করা হয় বনানী ওল্ড ডিভিশন থেকে। আর তোমার শরীর উদ্ধার বলতে বোঝাচ্ছি মৃত অবস্থায় তোমার শরীর উদ্ধার। আর শুধু তোমার শরীর না, এমন লক্ষ লক্ষ শরীর উদ্ধার করেছি আমরা। এসব শরীর দিয়ে সাইবর্গ বানানো হবে। যাদের দেশের কাজে লাগানো হবে।‘

‘সাইবর্গ! মৃত শরীর! কি বলছো এসব!’

‘হ্যা, তুমি সাইবর্গ মডেল বি-৪১৬। যার কোনো ইমোশন, মেমোরি, ইচ্ছা…কিচ্ছু নেই। এদের শুধু যুদ্ধের কাজে ব্যবহার করা হয়। আর তুমি এত প্রশ্ন করছো কিভাবে? কোনো সমস্যা হলো না তো! দাড়াও দেখতে দাও।‘

তার কথাগুলো আমার কাছে অলৌকিক মনে হচ্ছিলো তখন। কি করে হতে পারে এসব! আর, আমি যে আগের কিছুই মনে করতে পাড়ছি না।

আমি আবার বলি, ‘আমার আগের জীবনের কিছু মনে পড়ছে না কেন! কিভাবে এলাম আমি এখানে! উত্তর দাও আমায়!’

‘আরেহ বাবা বললাম তো! কারন তোমার মেমোরি নষ্ট করে দিয়েছি আমরা। যেনো তুমি যুদ্ধে সম্পূর্ণ মনোনিবেশ করতে পারো। যুদ্ধ্বের সময় যেন তোমার কোনো মেমোরি এসে বাধা না দিতে পারে।‘

আমি এসব শুনে চিৎকার করে উঠলাম। গায়ের সম্পূর্ণ শক্তি দিয়ে নিজেকে ছাড়ানোর আপ্রান চেষ্টা করলাম। আমার এই অবস্থা দেখে বিষম কয়েকবার আমাকে থামানোর প্রচেষ্টা করেও পারলো না। এরপর ভয় পেয়ে প্রোফেসর কে ডাকতে ছুটে গেলো। কিছুক্ষন পর প্রোফেসর এসে আমার পাশে রাখা একটা বক্সে কিছু করতে শুরু করলে সাথে সাথে আমি চুপ হয়ে গেলাম। আমার মাঝে রাগ যা ছিলো সব নিমিষেই চলে গেলো।

এরপর সে আমায় বললো, ‘তোমার এরকম আচরণ কি করে হচ্ছে? কোনো ম্যাল ফাংশন হলো না কি! আর, আমরা তো উলটো তোমার প্রাণ বাঁচিয়েছি। নইলে তোমাকে রাস্তায় পড়ে থাকতে হতো। তুমি মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে যদি আমরা তোমাকে না বাঁচাতাম।‘

কিন্তু, আমি তার কথা শুনে আবার রেগে যাই আর আগের মত করতে শুরু করি। আর এবারো প্রোফেসর সেই একই বক্সে একই কাজ করলে আমি শান্ত হয়ে যাই।

এরপর সে বললো, ‘দেখো, ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। তোমার আগের জীবন অনেক খারাপ ছিলো। তাই আমরা তা মুছে দিয়েছি। এখন তুমি নতুন জীবন পেয়েছো। এই জীবনে মন দেয়ার চেষ্টা করো। আর আমরা তোমায় এখন খুলে নতুন করে আপগ্রেড করবো। কিছু একটা সমস্যা হয়েছে অবশ্যই। নইলে তোমার এরকম করার কথা না।‘

এখন আমার রাগ হচ্ছেনা ঠিক, তবে আমি কেনো যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আমি কেনো আমার আগের জীবন মনে করতে পাড়ছি না?’

প্রোফেসর মাথার চুল হাতিয়ে আমার যান্ত্রিক শরীর দেখতে দেখতে বললো, ‘ আমাদের জীবনে যখন একটা খারাপ মেমোরি তৈরি হয়, আমরা তা কি করি? ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমরা চাই না সেটা মনে করতে। কারন, আমাদের ব্রেইন চায় না খারাপ মেমোরিগুলো সবসময় সামনে রাখতে। আমাদের ব্রেইন সহজ কাজ পছন্দ করে আর খারাপ মেমোরি হচ্ছে কষ্টকর। তাই এই খারাপ মেমোরিগুলো কোথাও লুকিয়ে পড়ে। গা ঢাকা দেয়, যার ফলে অনেকেই খারাপ মেমোরি ভুলে যায়। মনে করতে পারে না। তাই, এই প্রক্রিয়া কাজে লাগিয়ে তোমার সব মেমোরিতে আমরা প্রবেশ করেছি আর তা একটা খারাপ মেমোরি বানিয়ে দিয়েছি। যার ফলে তোমার ব্রেইন সেগুলো ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করবে আর মেমোরিগুলো গা ঢাকা দিতে শুরু করবে। তখন সেই মেমোরিগুলো ডিটেক্ট করে আমরা তোমার ব্রেইন থেকে নিষ্কাশন করে দিয়েছি। এর ফলে তোমার এখন আগের কোনো মেমোরি নেই।‘

‘তার মানে আমি… কখনো কিছুই মনে করতে পারবো না?’

‘না’

এটা বলে সে ডিভাইস চেক করতে শুরু করলে আমার মাথা ঝিম ধরে এলো। এক পর্যায়ে অসহ্য মাথাব্যথা শুরু হলে আমি যন্ত্রনায় বলে উঠি,

‘কিন্তু আমার কিছু একটা মনে পড়ছে।‘

‘কি!‘

‘আমি কিছু মনে করতে পাড়ছি…’

বিষম তখন দ্রুত হাতের ডিভাইস দেখতে শুরু করলে প্রোফেসর বললো, ‘আমরা তোমার সব মেমোরি ডিলিট করে দিয়েছি। কোনো মেমোরি থাকা সম্ভব নয়। কি বলছো! ম্যালফাংশন হচ্ছে সম্ভবত!‘

বিষম ধীরে ধীরে ডিভাইস থেকে মাথা তুলে প্রোফেসরকে বললো, ‘বি-৪১৬ এর ব্রেইন কিছু আনআইডেন্টিফাইড মেমোরির দখলে আছে এখন। কিন্তু… কিভাবে?‘

একথা শুনে প্রোফেসর ডিভাইসটি হাতে নিয়ে চেক করলে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো। সে ধীরে ধীরে বললো, ‘ওর জীবনে আগেই কিছু বাজে মেমোরি ছিলো যা অনেক আগেই গা ঢাকা দিয়ে ছিলো। এখন ব্রেইনে আর কোনো মেমোরি না থাকায় সেগুলো বের হয়ে জায়গা নিয়েছে পুরো ব্রেইন জুরে।‘

এটা বলতে বলতে সে রবিনের দিকে তাকালে দেখতে পেলো রবিন গায়ের জোরে সবকিছু ভেঙে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। প্রোফেসর ও বিষম কয়েক পা পিছিয়ে নেয় ভয়ে। প্রোফেসর কাপা গলায় বিষম কে বলে, ‘দ্রুত বি জোনের ম্যাগনেটিক ফিল্ড চালু করো। দ্রুত বিষম! দ্রুত!‘

বিষম প্রোফেসরের কথা শুনে কয়েক পা পিছালে এর মাঝে রবিন ঝাপিয়ে পড়ে প্রোফেসরের ওপর। সেই রক্তের ঝাপটা গিয়ে বিষমের গায়ে লাগে। বিষম ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বোকার মত দাড়িয়ে থাকে সেখানে। তার হাত পা ঠান্ডা হয়ে যায় রবিনকে দেখে। এরপর রবিন তার দিকে ছুটে আসলে সে চোখ বন্ধ করে ফেলে এটা ভেবে যে আজ সব শেষ হয়ে যাবে।

 

By তাহমিদ নাসিফ তমাল 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *