একজন দেশপ্রেমিক

রায়হান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এখন তাকে দীর্ঘসময়ের জন্য অতীতে থাকতে হবে। এক মাসেরও বেশি। এরকম সুযোগের জন্য ৪টারও বেশি সেমেস্টার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় ছাত্রছাত্রীদের। অবশেষে তাদের ফিফথ ইয়ারে এসে তারা একটি এসাইনমেন্ট পায়। অতীত ভ্রমণ করে প্রাচীনকালে বিভিন্ন দেশ-বিদেশ যেসব ক্রাইসিসের সম্মুখীন হয়েছে সেরকম একটি সময়ে টাইম-ট্রাভেল করে সেখানেকার পরিস্থিতি নিজের চোখে মূল্যায়ন করে একটি রিপোর্ট রেকর্ড জমা দিতে হয়। প্রত্যেক ফিফথ ইয়ার ছাত্রছাত্রীর জন্য এই এসাইনমেন্ট মেন্ডেটরি।

রায়হান এই সুযোগের আশায় অনেকদিন ধরে বসে ছিলো, অবশেষে যখন সুযোগটি পেলো তার আনন্দ দেখে কে। গত ২ মাস ধরে সে তার এসাইনমেন্টের প্লেনিং করছে। তার টাইম মেশিন রিপেয়ারিং এর জন্য একমাস আগে পাঠিয়েছিল। গতকাল ভালোমত মেইন্টেনেন্স করিয়ে বাসায় নিয়ে এসেছে। কোন ক্রাইসিস এর সময়ে যাবে সেটি নিয়ে সে অনেক ভেবেছে, অনেক চয়েস আছে, বিংশ শতাব্দীর বিশ্বযুদ্ধগুলো আছে, সেখানে যাওয়া যায়। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধ অনেক বড় একটি ক্রাইসিস ছিলো তৎকালীন সময়ে। এটার উপর এসাইনমেন্ট করলে অনেক বড় রিপোর্ট লিখতে হবে। আর তাছাড়া তার সেমেস্টারের অনেক ছাত্রছাত্রী ইতোমধ্যেই বিশ্বযুদ্ধের উপর কাজ করছে। তাই এই টপিক বাদ দিলো। সে তার পরিবারের সাথেও এটি নিয়ে আলাপ-আলোচনা করলো। তার মা-বাবা আইডিয়া দিলেন বিংশশতাব্দীর কোল্ড ওয়ারের সময়ে সময় পরিভ্রমণ করা যায়। রায়হানের কাছে কোল্ড ওয়ারের সময়টাও অনেক দুর্বিষহ মনে হলো, এটাও এসাইনমেন্টের জন্য অনেক বড় একটি টপিক, তাছাড়া অনেকেই কোল্ড ওয়ারের উপর এসাইনমেন্ট করছে। রায়হান চাচ্ছে এমন একটা টপিকের উপর এসাইনমেন্ট করতে যেটা সবার চেয়ে একটু আলাদা, একটু ইউনিক। পরিশেষে সবচেয়ে ইউনিক আইডিয়া দিলেন রায়হানের গ্রেট গ্রান্ডফাদার। এসাইনমেন্ট পাওয়ার দুইদিন পর পরিবারের সকলের সাথে ডিনার খেতে বসেছে রায়হান। এসাইনমেন্টের টপিক নিয়ে পরিবারের সাথে কথাবার্তা করে যখন রায়হান দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, তখন তার গ্রেট গ্রান্ডফাদার বললেন, “ তুই তোর এসাইনমেন্টের জন্য একটা ইউনিক টপিক খুজছিস? তাইনা?

“জী দাদা” রায়হান বলল।

“তুই কি জানিস আমাদের আদি-পৈত্রিক নিবাস কোথায়?”

“হ্যা জানি, বাংলাদেশ নামের একটি দেশে আমাদের আদি পৈত্রিক-নিবাস। যে দেশ ২০৬০ সালের দিকে পানিতে তলিয়ে যায়, তখন আমার পূর্বপুরুষেরা উত্তরাঞ্চলে সড়ে গিয়ে অবশেষে পৃথিবীর নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।” রায়হান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।

“হুম সেই সময়টায় আমার বয়স ছিলো মাত্র ১০ বছর। কত কষ্ট যে হইছিলো আমাদের। বাংলাদেশের দক্ষিণের সব অঞ্চল তো ২০৫৫ সালেই ডুবে গিয়েছিলো, ২০৬০ সালের দিকে দেশের রাজধানী ঢাকাও সমুদ্রের পানিতে আস্তে আস্তে সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যেতে থাকে। বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার প্রথমেই বুঝে গিয়েছিলো, সমুদ্রের এরকম বাড়ন্ত পানি থেকে আমাদের এই ছোট্ট রাষ্ট্রকে কোনভাবেই বাঁচানো সম্ভব না। তারপরেও তৎকালীন সরকার নানাভাবে দেশটাকে সমুদ্রের পানি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা চালিয়েছিলো, দক্ষিণদিকে একটা ৬ কিলোমিটার উঁচু একটি বাঁধ তৈরি করা হয়েছিলো ২০৫৫ সালে। এজন্য ঢাকা ও অন্যান্য উত্তরবঙ্গের অঞ্চলগুলো অনেক সময়ের জন্য নিরাপদ ছিলো। কিন্তু শেষে পানি যখন ৫ কিলোমিটার উঁচুতে অবস্থান করেছিলো সেইসময় একটা সাইক্লোন এসেছিলো, যেটা পুরো বাঁধকে নিমিষেই ধ্বংস করে ফেলে। সাথে সাথে ঢাকা ও অন্যান্য উত্তরবঙ্গের অঞ্চলের নিমিষেই পানির মধ্যে তলিয়ে যায়। আমরা অনেক আগেই দেশের পরিস্থিতি দেখে আমার বাবা আমাকে নিয়ে অনেক আগেই আমেরিকায় সটকে পড়েছিলো, যখন নিউজ পোর্টালে দেখলাম বাংলাদেশ নামের কোন দেশের অস্তিত্ব আর নেই, পুরোটাই পানিতে তলিয়ে গেছে, তখন কষ্টে আমার বুকটা একদম ভেঙ্গে যাচ্ছিলো, বুঝলি রায়হান। নিজের আপন একটি দেশ, যেখানে আমি জন্মগ্রহণ করেছি সেই দেশকে আমরা হারালাম ২০৬০ সালে। এখন ২৩০০ সাল। আগেরকাল মানুষরা ৬০-৭০ বছরেই মারা যেত, বিজ্ঞানের কৃপায় আজকে মানুষ ২০০ বছর পর্যন্ত বাঁচে। আমার নিজেরই বয়স ২৫০ বছর। কিন্তু এখনো বাংলাদেশের কথা মনে পড়লেই নিজের চোখ আপনাতেই ভিজে উঠে।”

গ্রেট গ্রান্ডফাদারের চোখ ইতোমধ্যেই ভিজে উঠেছে। তিনি তার চোখের পানি মোছার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলেন না। ডিনারের টেবিলে একটা নৈশব্দ বিরাজ করছে। রায়হান তার কাটলেটের শেষ অংশটা শেষ না করেই উঠতে উঠতে বলল, “দাদু, হটাত করে আপনি বাংলাদেশের কথা তুললেন কেন?”

রায়হানের গ্রেট গ্রান্ডফাদার একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তোর এসাইনমেন্ট অনুযায়ী তোকে এমন একটা সময়ে পরিভ্রমণ করতে হবে যখন একটা দেশ একটা স্পেসিফিক ক্রাইসিস ফেস করছিলো। ২০৬০ সালে টাইম-ট্রাভেল করবি নাকি? বাংলাদেশের ক্রাইসিস এর ব্যপারেই নাহয় একটা রিপোর্ট লিখিস, তোর এসাইনমেন্টের জন্য, একটু ভেবে দেখ, আইডিয়াটা কিন্তু খারাপ না।”

রায়হান একটু ভাবল। আইডিয়াটা সত্যি খারাপ না। তার পূর্বপুরুষ একটা সময়ে বাংলাদেশ নামক দেশটির বাসিন্দা ছিলো। সেই ছোটবেলা থেকে রায়হান তার গ্রেট গ্রান্ডফাদারের কাছে তার পূর্বপুরুষদের দেশ বাংলাদেশের কাহিনি শুনতো, গ্রেট গ্রান্ডফাদার বলতেন, বাংলাদেশ খুবই সুন্দর একটা দেশ ছিলো, যেখানেই তাকাবি, শুধু শস্যখেত আর সবুজ গাছপালা দেখতে পাবি। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বনাঞ্চল অনেক বেশি ছিলো। দেশের আয়তনের ভিত্তিতে বনাঞ্চল বাড়ানোর ক্ষেত্রে শেষের দিকে বাংলাদেশ সরকার অনেক গুরুত্ব দিয়েছিলো। কিন্তু কার্বন এমিশন এতোই বেড়ে গিয়েছিলো পৃথিবীতে যে মেরু অঞ্চলের বরফ গলতে শুরু করলো। ২০৫০ সালের দিকে সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধির জন্য দক্ষিণাঞ্চল ডুবে যায় সাগরে, ২০৬০ সালের দিকে পুরো দেশটাই পানিতে ডুবে যায়।

রায়হানের অনেকদিনের ইচ্ছা, তার পূর্বপুরুষদের দেশটায় সময় পরিভ্রমণ করা। এই এসাইনমেন্টের অব্যাহতি দিয়েই নাহয় ওই সময় থেকে ঘুরে আসা যায়। পরিশেষে রায়হান এটাই সিদ্ধান্ত নিলো, এই টপিকের উপরই সে তার এসাইনমেন্ট করবে। গ্রেট গ্রান্ডফাদারকে তার সিদ্ধান্তের কথা জানানোর পর তিনিও সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেন।

“যাক, আমার গ্রেট গ্রান্ডসন তাহলে আমার দেশের অন্তিম সময়ে সময় পরিভ্রমণ করবে। ইস টাইম ট্রাভেল এর বিষয়টা যদি একটু আগে আবিস্কার হতো।এখন আমার বয়স হয়ে গেছে, আগের মতো আর স্বাস্থ্য নাই, নাহলে অনেক আগেই টাইম ট্রাভেলের জন্য লাইসেন্সের এপ্লাই করতাম। আমারো খুব ইচ্ছা করে, ২৪০ বছর আগে যে দেশটিকে সাগরের নিচে ফেলে এসেছি সেই দেশটিতে আবার ফিরে যাওয়া।” রায়হানের গ্রেট গ্রান্ডফাদার বললেন।

“আমারো আসলে খুব ইচ্ছা করতো দাদু, যখন আপনি ছোটবেলায় আমাকে আমাদের পূর্বপুরুষদের দেশের গল্প শোনাতেন, আমারো স্বপ্ন ছিলো, এই দেশে একবারের জন্য হলেও সময় পরিভ্রমণ করা।”

“যাক, তুই আমার হয়ে স্বপ্ন পূরণ করছিস” গ্রেট গ্রান্ডফাদার সন্তুষ্টির নিশ্বাস ফেললেন।

এর পরের কয়েকদিন রায়হান বাংলাদেশ নামক দেশটির ব্যপারে অনেক পড়াশোনা করলো, কিভাবে এই দেশটি ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হয়, কিভাবে এই দেশ আস্তে আস্তে উন্নতির দিকে ধাপিত হয় এবং পরিশেষে কিভাবে এই দেশ সাগরের নিচে তলিয়ে যায়। তার এসাইনমেন্টের মূল কাজ সব ইভেন্টগুলো দেখে যাওয়া শুধু, তারপর সেগুলো তার রিপোর্টে লিপিবদ্ধ করা। তার ডিপার্টমেন্টের ইন্সট্রাক্টর একটা বিষয়ে অনেক গুরুত্ব দিয়েছেন, যেকোনো মূল্যেই হোক, একজন টাইম ট্রাভেলারের উপস্থিতিতে যেনো কোনভাবেই অতীত পরিবর্তিত যেনো না হয়, যদিও অতীতে একজন টাইম ট্রাভেলার কোন পরিবর্তন আনলে সেটা ভবিষ্যৎকে কোনভাবেই এফেক্ট করেনা, কারণ টাইম ট্রাভেলের কন্সেপ্টটা কিছুটা এরকম, একটা ইউনিভার্সের পাশে, আরো হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ প্যারালাল ইউনিভার্স রয়েছে, সেগুলোর টাইমলাইনগুলো একইরকম না। কোনোটা একটার চেয়ে এগিয়ে আছে, কোনোটা পিছিয়ে আছে। কিন্তু প্রত্যেক ইউনিভার্সের ইভেন্টগুলো একইরকম। যেমন ধরা যাক, একটা ইউনিভার্সে করিম নামক একজন আছে, সে একদিন ছাদ থেকে লাফ দিলো। তার তখন বয়স ছিলো ১০ বছর। আরেকটি ইউনিভার্সে করিম মাত্র ১ বছরের শিশু, কিন্তু সে ছাদ থেকে লাফ দিবে আরো দশ বছর পর। এভাবেই প্যারালাল ইউনিভার্সগুলো কাজ করে আর একটা ইউনিভার্স থেকে আরেকটা ইউনিভার্সে যাওয়ার উপায় হলো একটা ওয়ার্মহোল ক্রিয়েট করা যেটা ক্রিয়েট করতে সাহায্য করে টাইম-মেশিন নামক ছোট্ট চারকোণা একটা ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস দ্বারা। সময় পরিভ্রমণ করার জন্য এই ডিভাইসটি হাতে ব্যান্ডের মতো পরিধান করতে হয়। এটি চালু করার সাথে সাথে একটি কালো রঙের গোলক সামনে হাজির হয়।এটাকে বলে ওয়ার্মহোল। যে টাইমটা টাইম ট্রাভেলার সেট করবে তার টাইম মেশিনে সেই টাইমে কালো রঙের গোলকটি তাকে পৌছিয়ে দিবে। এটাই হলো টাইম মেশিনের কনসেপ্ট। তারপরেও তার ইস্টিটিউশন থেকে বলা হয়েছে, কোনোভাবেই অতীতকে যেনো কেউ পরিবর্তন করে না বসে। কোনো টাইম ট্রাভেলার অতীতে কোনো পরিবর্তন আনলে সাথে সাথে তাকে টাইম পেট্রল এরেস্ট করবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে বহিষ্কার করা হবে।

রায়হানের টপিকের উপর প্রাথমিক সব রিসার্চ শেষ। আর দুইদিন পর তার টাইম ট্রাভেল। কিন্তু এই সময় একটা ঘটনা ঘটলো।

রায়হানের গ্রেট গ্রান্ডফাদার ইন্তেকাল করলেন। রায়হানের খুব কাছের একজন ছিলেন তিনি। হটাত করে তিনি ইন্তেকাল করলেন, বিষয়টা মেনে নিতে পারছিলো না রায়হান। তার মৃত্যুতে রায়হান সহ তার পরিবারের সকলেই মুষড়ে পড়েছে। বিকাল ৬টার আগেই গ্রেট গ্রান্ডফাদারের কবর হয়ে গেলো। রায়হান নিজের ভেতরে এক-প্রকার শূন্যটা অনুভব করছিলো। টাইম ট্রাভেলের ট্রিপটার জন্য যে এক্সাইটমেন্ট কাজ করছিলো সেটি তার মধ্যে আর নেই। পরেরদিন রায়হান তার গ্রেট গ্রান্ডফাদারের স্টাডি টেবিলে একটা চিঠি খুঁজে পায়। চিঠিটি তাকে লক্ষ্য করেই লেখা হয়েছে। সেখানে লেখা,

বাবা রায়হান,

আমি আসলে জানতাম আমার দিন ঘনিয়ে আসছে, প্রত্যেক মৃত্যুপথযাত্রী তার মৃত্যুর ঘনিয়ে আসাটা আগেভাগে অনুভব করতে পারে। আমিও অনুভব করেছিলাম কিন্তু কাওকে কিছু বলি নাই। কি দরকার সবার দুশ্চিন্তা বাড়ানো?অনেকদিনই তো বাচলাম, ২৫০ বছর! আমার নিজের বাবাই মাত্র ৮০ বছর বেঁচেছিলেন, আমার দাদা বেঁচেছিলেন ৭২ বছর। তোকে কখনো বলি নাই, আমার দাদা কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলো। বাংলাদেশ স্বাধীন করার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন, এজন্যই পারিবারিকভাবে বাংলাদেশের জন্য আমাদের এতো টান। যাইহোক বাবা, আমার মৃত্যুতে একদম মন খারাপ করবি না, যেটা বলতে চাচ্ছিলাম তুই যখন রাজি হলি তুই বাংলাদেশে তোর টাইম-ট্রাভেলের এসাইনমেন্ট করবি, আমি যে কি খুশি হয়েছিলাম, বলার মতো না। আমার ড্রয়ারের নিচে দেখ একটা থ্রি-ডাইমেনশনাল ব্যাগ পাবি। সেখানে কিছু জিনিস আছে। খবরদার ব্যাগটা খুলবি না এখন। যেটা করবি সেটা হলো, ব্যাগটা সাথে করে নিয়ে যাবি অতীতে। ওখানে যেয়ে খুলবি। দেখবি অনেকগুলো জিনিসের সাথে ওখানে একটা চিঠি আছে। ওটাও খবরদার এখন খুলবি না, অতীতে যেয়েই খুলবি। চিঠিতে আমি তোকে একটা রিকুয়েস্ট করেছি, আমি জানি না তুই আমার রিকুয়েস্ট রাখবি কি রাখবি না, তবে তুই যদি আমার অনুরোধটা রাখিস, তাহলে আমি মরেও শান্তি পাবো। অনেক ভালোবাসা ও শুভকামনা রইলো।

ইতি

তোর পরদাদা

রায়হান তার গ্রেট গ্রান্ডফাদারের স্টাডি টেবিলের ড্রয়ার খুলে ছোট একটি কাঁধে ঝুলানোর থ্রি ডাইমেনশনাল ব্যাগ পেলো। থ্রি-ডাইমেনশনাল ব্যাগের স্পেশালিটি হলো, অনেক ভারি ও বড় বড় জিনিস এই ব্যাগে সহজেই বহন করা যায়। রায়হান ভেবে পেলো না, তার গ্রেট গ্রান্ডফাদার ভিতরে এমন কি জিনিস রেখেছে এবং সেটি কেনো তাকে অতীতে নিয়ে যেতে হবে। রায়হানের গ্রেট গ্রান্ডফাদার রায়হানের খুব কাছের একজন ছিলো। তিনি কোন কথা বললে রায়হান কখনো অবাধ্য হয়নি, এবারও হওয়ার প্রশ্ন উঠছে না।

আজকে সেই বিশেষ দিন। আজকেই তাকে টাইম ট্রাভেলের জন্য প্রস্তুত হতে হবে। এক্সাইটমেন্টে তার কাল সারারাত ঘুম হয়নি। সকালে তার মা-বাবার সাথে ব্রেকফাস্ট করলো, বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে টাইম ট্রাভেলের শেষ একটা ট্রায়াল দিলো, টাইম ট্রাভেলের প্রযুক্তির আবিষ্কার বেশিদিন হয়নি। এখনো প্রচুর লুপহোল আছে প্রযুক্তিতে। কোনক্রুমেই যেন ভুল না হয়। ট্রায়াল দিয়ে বাড়িতে এসে সে রেডি হলো,সবার আগে তার গ্রেট গ্রান্ডফাদারের থ্রি-ডাইমেনশনাল ব্যাগটি ঘাড়ে নেয়। সেখানে তার আরো কিছু জিনিস ঢুকিয়ে নেয়। কিছু শুকনো খাবার, ওরাল ট্রান্সলেটর, রিপেয়ারিঙ্গের জন্য কিছু টুলস। থ্রি ডাইমেনশনাল কাপড়। এই কাপড়ের বিশেষত্ব হচ্ছে এটি যেকোন কাপড়ের রূপ নিতে পারে। অতীতে ওখানকার মানুষের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য খুবই জরুরি এটি। তার রিসার্চ পেপার এবং তার সাথে তার পার্সোনাল কম্পিউটারটিও সাথে নিয়ে নিলো। দুপুর ঠিক ১:৩০ সে সবকিছু ঠিকঠাক করে টাইম মেশিন অন করার জন্য প্রস্তুত হলো, তার মা-বাবা পাশে দাঁড়িয়ে আছে। গর্বে তাদের চোখ ঝলমল করছে। রায়হান এই সময় তার গ্রেট গ্রান্ডফাদারকে খুব মিস করছে। রায়হান একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেশিনটি অন করার সাথে সাথে একটা কালো গোলক সৃষ্টি হলো রুমজুড়ে। রায়হান শেষবারের মতো সবার দিকে তাকিয়ে বিদায় নিয়ে কালো গোলকটির দিকে এগিয়ে গেলো।

২ এপ্রিল ২০৫০
চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ

হটাত করে একটা কালো গোলক শহরের একদম আদ্যিপ্রান্তে তৈরি হলো। সাধারণ কোন মানুষ দেখলে অবাক হয়ে যেত। কিন্তু আসেপাশে কেউ নেই। কালো গোলক- যেটাকে ওয়ার্মহোল বলা হয়, সেখান থেকে রায়হান বের হলো। বের হয়েই অবাক হলো খুব। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। রায়হান বুঝতে পারলো, সে যেখানে দাঁড়িয়ে আছে একসময় সেটি একটি দোতলা বাড়ি ছিলো। রায়হান তার থ্রি ডাইমেনশনাল ব্যাগ থেকে তার থ্রি-ডাইমেনশনাল কাপড়টি পড়ে নেয়, তৎক্ষণাৎ সেটি পানজাবি ও পায়জামার রূপ নেয়, এই সময়ের ট্রেডিশনাল কাপড়। ব্যাগ থেকে ওরাল ট্রান্সলেটরটি বের করে সেটি পড়ে নেয়। এমন সময় পিছ থেকে কেউ একজন ডেকে উঠলো,

“ও ভাইজান।”

রায়হান চমকিয়ে উঠলো। দেখলো পিছ থেকে একজন নৌকা বইতে বইতে আসছে। মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। গায়ের রঙ তামাটে। পরনে লুঙ্গি এবং একটি শার্ট। “ও ভাই, এরকম বিপজ্জনক সময়ে কি করেন এখানে? নৌকায়ে উঠে আসেন।”

“বিপজ্জনক সময় মানে?” রায়হান বেশ কৌতূহলী। এবং বেশ সন্তুষ্ট, ওরাল ট্রান্সলেটরটা ভালোভাবে কাজ করছে, দুজনই একই অপরের কথা বুঝতে পারছে।

“ আরে ভাই, নৌকায় উঠেন আগে।” লোকটার সুরে বেশ তাড়াহুড়া।

রায়হান কোন কথা না বলে নৌকায় উঠে পড়ল। নৌকা চলতে শুরু করলো। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। তার দাদাজানের ভাষ্যমতে এই জায়গার নাম চট্টগ্রাম এবং ৫ বছর আগে এই জায়গাটা একটি ব্যস্ত শহর ছিলো, এখন সমুদ্রের পানিতে শহরটি ১০ ফুট পানির নিচে।

“ নিশানা খুব একটা ভালো না। তাড়াতাড়ি নৌকা চালাতে হবে” নৌকা চালাতে চালাতে লোকটা বলল।

রায়হান এখন একটি কনফিউজড, “ ভাই সমস্যাটা কি এক্সাক্টলি?”

“আরে ভাই, বুঝেননি? বিরাট বড় একটা সাইক্লোন আইতেসে। ১০ মিনিটের মধ্যে সেল্টারে না গেলে সাইক্লোন উড়াইয়া লইয়া যাইবে। ১০ নম্বর বিপদ সংকেত।”

রায়হানের কাছে এবার ব্যপারটি পরিষ্কার হলো। একটা সাইক্লোন হবে এখন। আর এরকম একটা জায়গায় সে সময় পরিভ্রমণ করলো! আসেপাশে কোন মানুষ না থাকলে সে এক্ষনি আরেকটা লকেশনে শিফট করতো তার টাইম মেশিন ডিভাইসটা দিয়ে।

“ ভাই, আপনাকে তো আগে কখনো দেখেনি, কত্থেকে আইসেন?” নৌকার মাঝি প্রশ্ন করলো।

রায়হান ভেবে পেলো না কি উত্তর দিবে, ভবিষ্যৎ থেকে এসেছে, এটা তো কোন ভাবেই বলা যাবে না। আমতা আমতা করে বলল, “ ইয়ে…মানে আসছি ওইদিক থেকে।”

“বিদেশি নাকি? অবশ্য আপনার কথা শুনে বিদেশি মনে হইতেসে না, ভালোই তো বাংলা পারেন দেখি।”

রায়হান মুচকি হাসল। কিন্তু কি বলবে ভেবে পেলো না। এরকম পরিস্থিতির জন্য সে আগেভাগে প্রস্তুত ছিলো না।

দূরে একজনকে দেখে মাঝি নৌকা থামালো, “ওহহ পাগলা ডাক্তার, এহোনো বাড়িতেই আছেন? এখানে থাকলে তো মারা পড়বেন।”

যাকে উদ্দেশ্য করে মাঝি ডাকছে সে কোন ভ্রুক্ষেপ করলোই না। সে সোজা মাঝির নৌকায় উঠে বসলো। “নিয়ে চল রফিক। সেল্টারে নিয়ে চলো।”

বলেই পাগলা ডাক্তার ডুকরে কাঁদতে লাগলো। তিনি বুড়ো একজন মানুষ, চুল দাঁড়ি সব সাদা। হটাত করে লোকটাকে কাঁদতে দেখে রায়হান বিচলিত হয়ে গেলো। জিজ্ঞ্যেস করলো, “ আঙ্কেল, হয়েছেটা কি? কাঁদছেন কেন?”

লোকটি ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল, “ এই দেশটাকে বাঁচাতে পারলাম না, আমি পুরোপুরি ব্যর্থ। আমার দশবছরের রিসার্চ সব ব্যর্থ।”

নৌকার মাঝি সাহেব বললেন, কাইন্দেন না ডাক্তার সাহেব। পুরা দেশ যে একদিন পানিতে ডুইবা যাইতো, এটা আগে থেকেই কপালের লেখন ছিলো। টিভির ওসব বিজ্ঞানির কথামতো খুব শীঘ্রই চট্টগ্রামের মতো পুরা দেশ ডুইবা যাবে। ধরে নেন এটাই কপাল। এখন এই জলাঞ্চল থেকে যত তাড়াতাড়ি সটকে পড়া যায় তত ভালো।”

রায়হানের এখন খুব কৌতূহল হলো। সে সরাসরি লোকটাকে জিজ্ঞেস করলো, “ ভাই আপনার পরিচয় কি?”

“আমার নাম আনিসুর রহমান। আমি ক্লাইমেট এন্ড সি লেভেল রাইজের উপর গত দশ বছর ধরে গবেষণা করছি।”

“আপনি যে বললেন দেশকে বাঁচাতে পারেননি, সেটা বলতে আপনি কি বোঝাচ্ছিলেন?”

পাগলা ডাক্তার বিব্রতসুরে বলল, “আসলে আমি অনেক আগেই থেকে গবেষণা করে বের করেছি, সাগরের পানি শুধু দক্ষিণাঞ্চলকেই ডুবিয়ে দেবে না, আস্তে আস্তে সেটি পুরো বাংলাদেশে সাগরের পানি এগিয়ে আসবে, আর দশ বছরের মধ্যে পুরো দেশটাই পানির মধ্যে ভেসে যাবে। আমি ও আমার টিম নানাভাবে চেষ্টা করেছি সি লেভেল রাইজ যেন আমাদের এফেক্ট করতে না পারে, দক্ষিণ দিকে ব্যারেজ বানিয়েছি, কার্বন এমিশন কমিয়েছি, আরো অনেকরকম প্রজেক্ট হাতে নিয়েছি, কিন্তু পরিশেষে আমরা সব দিক দিয়ে ব্যর্থ হয়েছি। এখন মাঝখানে এই সাইক্লোন এসেছে, সমুদ্রের পানি আরো উঁচুতে উঠবে, আরো অনেক ক্ষয়ক্ষতি করবে, শেষে আরো অঞ্চল পানির নিচে তলিয়ে যাবে। চোখের সামনে সবকিছু তলিয়ে যেতে দেখে সত্যি খুব কষ্ট হচ্ছে আমার।”

রায়হান আর কি বলবে কিছু ভেবে পেলো না। সত্যি এই সময়টা এই দেশের মানুষের জন্য অনেক বড় একটি ক্রাইসিস ছিলো।

সাইক্লোন সেল্টারে পৌছাতে পৌছাতেই হালকা হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। সেলটারের আসেপাশে অনেক মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো। মাঝি চিৎকার করে বলল, “ সবাই ভেতরে ঢুকেন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সাইক্লোনের ভয়াবহ তান্ডব শুরু হবে।”

ওইদিক থেকে একটা সাইরেন বেজে উঠলো। ১১ নম্বর বিপদসংকেত। তারমানে কেন্দ্রীয় আবহাওয়া কেন্দ্রের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। মানুষজন বিপদ্গ্রস্থ হয়ে পড়লো। তখন পাগলা ডাক্তার যিনি নিজেকে আনিসুর রহমান বলে নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, ভাইসব আতঙ্কিত হবেননা। আপনারা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেলটারে আশ্রয় নেন। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।”

আসেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মানুষরা সেলটারে ঢুকতে শুরু করলো। বিল্ডিংটি দোতলা সম্পন্ন অতি পুরোনো একটি বিল্ডিং। মাঝি তার নৌকা উঠিয়ে আমার আর ডাক্তারের হাত ধরে সেলটারে নিয়ে গেলেন।

বিকাল ৫টা

কিন্তু বাহিরের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে নিশুতি রাত। প্রচুর বাতাস বইছে বাহিরে। প্রত্যেক বাতাসের ঝাপ্টায় বিল্ডিংটি অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। এরকম সময় রায়হান তার থ্রি ডাইমেনশনাল ব্যাগ থেকে তার দাদাজানের জিনিসগুলো বের করতে লাগলো, ব্যাগ বোঝায় শুধু দুটি গেজেট দিয়ে। কার্বন সাকার মেশিন এবং ওয়াটার ট্রান্সপোর্টার। ব্যাগের ২০০০ স্কোয়ার কিলোমিটার আয়তনে শুধু এই দুটি মেশিন দিয়েই বোঝাই। আরেকটি জিনিস পেলো রায়হান। একটি মাঝারি সাইজের কিন্তু খুব পাওয়ারফুল একটি ভিপিএন। রায়হান খুব অবাক হলো। এই জিনিসটি তার ব্যাগে কি করছে? এই মেশিনতো অনেক আগেই পৃথিবী থেকে ব্যান করে দেওয়া হয়। এই গেজেট সাধারণত ব্যবহার হয় টাইম পেট্রোলের কাছ থেকে নিজের আইডেন্টিটি,টাইম ও লোকেশন গোপন রাখার জন্য। নিচের চেইনে রায়হান একটি চিঠি পেলো, সেখানে লেখা,

বাবা রায়হান,

আমি জানি তুমি খুব অবাক হচ্ছ, তোমার ব্যাগ কার্বন সাকার মেশিন(Carbon Sucker machine) এবং ওয়াটার ট্রান্সপোর্টার দিয়ে বোঝাই কেন। ব্যাখ্যা করছি। আমার আসলে একটা প্ল্যান ছিলো। বাংলাদেশকে সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচানো। অনেক কষ্ট করে নিজের আইডেন্টিটি, লোকেশন ও টাইম প্যারাডক্স হাইড করার জন্য একটা মাঝারি সাইজের ভিপিএন জোগাড় করেছি। সেটা জোগাড় করার জন্য আমাকে ৭দিন ৭রাত ক্যালিফোর্নিয়ার ব্লাক মার্কেটে ঘুরাঘুরি করতে হয়েছে। জিনিসটি সাথে রাখা ইল্লিগ্যাল, আগেই মনে হয় বুঝে ফেলেছো।

তোমাকে একটা ইল্লিগ্যাল কাজ করার জন্য অনুরোধ করছি। বাংলাদেশকে বাঁচাও। সমুদ্রে নিচে তলিয়ে যাওয়া থেকে এই দেশটিকে বাঁচাও তুমি। যদিও তুমি বাঁচাতে সক্ষম হউ কি না হউ, আমাদের ভবিষ্যৎকে এটা প্রভাবিত করবে না। তারপরেও একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত থাকতে পারবো, আমাদের পার্শ্ববর্তী প্যারালাল ইউনিভার্সগুলোতে at least বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র থাকবে। এটা ভেবেই আমি মনে মনে শান্তি পাবো।

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমার বাবা চট্টগ্রামে ক্লাইমেট রিসার্চার হিসেবে কাজ করতেন। তখন আমার বাবার সাথে একজন কাজ করতেন। তার নাম ডঃ আনিসুর রহমান। বাংলাদেশ পানির নিচে যখন তলিয়ে যায় তখন আমরা বিদেশে চলে গেলেও তিনি বাংলাদেশে রয়ে গেছিলেন। জীবনের শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত তিনি এই দেশটাকে তলিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলেন। তুই যেহেতু ২০৫০ সালের দিকে সময় পরিভ্রমণ করছিস, উনাকে তুই খুঁজে পেতে পারিস, তখন চট্টগ্রামেই থাকতেন উনি। আমি চাচ্ছি তুই উনার সাথে দেখা করে প্রযুক্তিগুলো হ্যান্ডওভার কর। কারণ হলো, আমি যে গেজেটগুলো তোকে দিয়েছি ওগুলো যদি তুই ব্যবহার করিস টাইম পেট্রোল সাথে সাথে তোকে ট্র্যাক করতে সক্ষম হবে। তাই ডঃ আনিসুর রহমানকে খুঁজে বের কর। আর উনাকে শিখিয়ে দে কিভাবে প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করতে হয়।

ইতি

তোর পরদাদা

রায়হান চিঠিটি পড়ে স্তম্ভিত হয়ে বসে থাকলো কিছুক্ষণ। গ্রেট গ্রান্ডফাদারের কোন কথাই কখনো ফেলেনি রায়হান। কিন্তু এই প্রথমবার একটি ইল্লিগ্যাল কাজ করতে বলেছে গ্রেট গ্রান্ডফাদার, সে যদি কোনভাবে ধরা পড়ে, সাথে সাথে তাকে এরেস্ট করা হবে এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হবে। কিন্তু ধরা পড়ার চান্স একদমই কম। তার কাছে অনেক পাওয়ারফুল একটি ভিপিএন আছে। না জানি কত ডলার খরচ করে তার গ্রেট ফাদার জিনিসটি কিনেছে। হটাত করে তার আনিসুর রহমানের কথা মনে হলো। উনার সাথে তো ইতোমধ্যে দেখা হয়ে গেছে। বাহ! কি কোইন্সিডেন্স। যাকে খুঁজার জন্য তার গ্রেট গ্রান্ডফাদার বলেছেন সে তার নিচের রুমেই বসে আছেন। রায়হান তার ব্যাগ গুছিয়ে নিচের রুমে গিয়ে আনিসুর সাহেবকে পেলো না।পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করলো, “ ভাই, এখানে আনিসুর রহমান নামক একটি লোক ছিলো। উনাকে কোথাও দেখেছেন কি?”

“ ওহ পাগলা ডাক্তারকে খুঁজছেন। নিচে যেতে দেখলাম উনাকে।’’

নিচে বাতাসের খুব ঝাপ্টা। দাঁড়িয়ে থাকাই দায়। কিন্তু রায়হান দেখলো বাহিরের গেটে এক হাটু পানি সমান পানির মধ্যে আনিসুর রহমান দাঁড়িয়ে আছেন। বলছেন, “ হে আল্লাহ, আমাকে উঠায়ে নাও, এখন আমার আর বাঁচার দরকার নাই, আমি পুরোপুরি ব্যর্থ।”

রায়হান চিৎকার করে উঠলো, ওহ আনিস সাহেব।”

আনিস ঘুরে তাকালো। চিনতে পেরে বলল, “আপনি এখানে কেন? তাড়াতাড়ি সেলটারে ঢুকেন!”

হটাত করে বাতাসের বড় একটি ঝাপ্টায় আনিস সাহেব পড়ে গেলেন। পানির স্রোত তাকে আস্তে আস্তে ডুবিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু পারছেন না। রায়হান ভেবে পাচ্ছে না কি করবে। সে তৎক্ষণাৎ তার থ্রি ডাইমেনশনাল কাপড়ের রূপ বদলিয়ে ফ্লাইং জ্যাকেটওয়ালা স্যুটের রূপ নিলো। সেই সাথে নিজের চারপাশে একটি বলয় বানিয়ে ফেলল। এখন তীব্র বাতাস তাকে প্রভাবিত করতে পারবে না। সে ফ্লাইং জ্যাকেটের গ্রাভিটেশনের মাত্রা নিজের কন্ট্রোলে রেখে উড়ে গিয়ে আনিস সাহেবের কাছে গেলো। উনি তখন পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছেন। তাকে ধরে এনে নিজের বলয়ের মধ্যে ঢুকালেন। এখন বাহিরের প্রচন্ড বাতাস আর বৃষ্টি তাদের আর প্রভাবিত করছে না। আনিস সাহেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন, “আপনি ওটা কিভাবে করলেন?”

রায়হান কিছু বলল না। থ্রি ডাইমেনশনাল কাপড় এর প্রযুক্তি অনেক জটিল। লোকটিকে বোঝানো এখন সম্ভব নয়।

আনিস সাহেব বললেন, “আপনার নাম কি ভাই, কোথা থেকে এসেছেন?”

রায়হান সিদ্ধান্ত নিলো সে আর কোন কিছু গোপন করবে না, বলল, “ আমার নাম রায়হান। আমি আসছি ভবিষ্যৎ থেকে।”

আনিসুর রহমান অবাক হলেন, “ভবিষ্যৎ থেকে?”

“হ্যা তার আগে এটা বলেনতো, আপনি কি আমার পরদাদার বাবা সাদিক হাসানকে চিনেন?”

“হ্যা হ্যা চিনি তো!” আনিসুর সাহেব বললেন, “ আমার সাথেই ক্লাইমেট রিসার্চে কাজ করতো। কয়েকদিন আগেই উনি আমেরিকায় চলে গেলেন রিসাইন করে।”

“হুম, আর আমি সাদিক হাসানের গ্রেট গ্রেট গ্রেন্ডসন রায়হান হাসান। সাদিক হাসানের ছেলে মানিক হাসান আপনাকে কিছু জিনিস দেওয়ার জন্য আমাকে পাঠিয়েছে।” বলেই রায়হান তার পিঠ থেকে থ্রি- ডাইমেনশনাল ব্যাগটি খুলে ওয়াটার ট্রান্সপোর্টার বের করে আনিসুর রহমানকে দেখালো, এই জিনিসটিকে বলে ওয়াটার ট্রান্সপোর্টার। এই জিনিস দিয়ে আপনি ১০ টনেরও বেশি পানি পৃথিবীর যেকোন স্থানে ট্রান্সফার করতে পারবেন।”

আনিসুর সাহেব চোখ বড় করে বললেন, “এটুকু মেশিন দিয়ে আমি ১০ টনের বেশি পানি যেকোনো জায়গায় পাঠাতে পারবো?”

“হুম।” রায়হান বলল, “এটা থ্রি ডাইমেনশনাল টেকনোলজি। আমার গ্রেট গ্রান্ডফাদার বলেছেন এই প্রযুক্তি আপনাকে হ্যান্ডওভার করতে।”

আনিসুর সাহেবের চোখ হটাত চকচক করে উঠলো, “ আরে, এই জিনিসতো মারাত্মক, আমার অনেক প্রবলেম সল্ভ করে দিবে এই জিনিস। বাংলাদেশকে পানিতে তলিয়ে যাওয়া থেকে এই মেশিন আমাদের রক্ষা করতে পারে।”

“হুম।” রায়হান বলল, “ আর এটা হচ্ছে কার্বন সাকার মেশিন। এই মেশিন দিয়ে আপনি পুরো পৃথিবী থেকে কার্বন ডাইওক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও কার্বন জাতীয় যেকোনো মৌল থেকেই কার্বন শুষে নিতে পারে। অনেক ক্যাপাসিটি আছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই ভবিষ্যতের পৃথিবী গ্রিনহাউজ ইফেক্ট থেকে রেহাই পেয়েছিলো।”

আনিসুর সাহেবের চোখ আবার চকচক করে উঠলো, “এই প্রযুক্তি তো আমরাও ব্যবহার করতে পারবো আমাদের গ্রিনহাউজের সমস্যা দূর করার জন্য। তাহলে মেরু অঞ্চলের বরফ আর গলবে না আর বাংলাদেশ পানির নিচে আর তলিয়ে যাবে না।” আনিস সাহেব খুশিতে লাফাতে লাগলো। তার এরকম বাচ্চার মতো লাফানো দেখে রায়হান মুচকি মুচকি হাসল, এমনি এমনি স্থানীয় মানুষ আনিস সাহেবকে পাগলা ডাক্তার ডাকে না।”

আনিস সাহেব বললেন, “ এখন আমার পুরোপুরি বিশ্বাস আপনি ভবিষ্যৎ থেকে আসছেন। আপনার কাছে আমরা চিরজীবন ঋণী থাকবো। বাংলাদেশকে বাঁচানোর জন্য এরকম প্রযুক্তি আমি বানানোর জন্য গত দশ বছর ধরে চেষ্টা করছিলাম, পারিনি। আপনি যে বাংলাদেশ নামক এই ছোট্ট রাষ্ট্রের জন্য কতবড় উপকার করলেন সেটা আমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।”

“ আমিও খুব গর্বিত আমার পূর্বপুরুষদের দেশটিকে রক্ষা করতে পেরে। এইযে এটা হাতে নেন।” বলে রায়হান তার হাতে ভিপিএনটি ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এটা সবসময় আপনার কাছে রাখবেন, টাইম পেট্রোল নামে একটা পুলিশ এজেন্সি আছে, তারা যেন আপনার এই প্রযুক্তিগুলোকে ট্র্যাক করতে না পারে সেজন্য এটা সবসময় আপনার কাছে রাখবেন।”

ততক্ষণ সাইক্লোনটি থেমে এসেছে। রায়হান পাগলা ডাক্তারকে শিখিয়ে দিলো প্রযুক্তিগুলো কিভাবে ব্যবহার করতে হয়। ওয়াটার ট্রান্সপোর্টার দিয়ে সাইক্লোনের অর্ধেক পানি নিমিষে গায়েব করে দিলো রায়হান। কার্বন সাকার দিয়ে কার্বনডাইওক্সাইডকে অক্সিজেন বানিয়ে দেখালেন আনিসুর সাহেবকে। রাত ৭টার দিকে আগামি দিনের ভবিষ্যৎ দেখার জন্য রায়হান টাইম টিভি অন করলো, দেখলো আনিস সাহেব তার টিম নিয়ে উঠে পড়ে লেগেছে তলিয়ে যাওয়া চট্টগ্রামকে আবার পানির উপরে তুলে আনার প্রজেক্ট। তিনি দেশ বিদেশে টিম পাঠিয়েছেন দেশের ক্লাইমেট রিসার্চ সেন্টার গুলোতে একটা করে কার্বন সাকার পৌছিয়ে দেওয়ার জন্য। তারা সেটি ব্যবহার করে গ্রিনহাইজ ইফেক্ট অনেকটাই কমিয়েছে। রায়হান ভাবল, এখন বাংলাদেশ নামক এই দেশটির সামনে কোন বিপদ নেই। চিরদিনের জন্য এই দেশ সবসময় সব দেশের মতোই সামনে এগিয়ে চলবে।

রায়হানের এসাইনমেন্ট হলো ক্রাইসিস সংলগ্ন একটি দেশের রিপোর্ট করা। যেহেতু এই দেশে এখন কোন ক্রাইসিস নাই, এখানে এসাইনমেন্ট করারও কিছু নেই। তাই সে ঠিক করলো আরেকটি সময়ে গিয়ে আরেকটি ক্রাইসিস এর রিপোর্ট করবে সে। রাত ১২টার আগেই সে টাইম মেশিন ব্যবহার করে আরেকটি সময়ে চলে গেলো। আনিস সাহেবের সাথে দেখা করলো না আর। কারণ টাইম ট্রাভেল তাকে আবার ট্র্যাক করা শুরু করেছে। এখন তার পরিস্থিতি আনিসুর রহমানের জন্য ক্ষতিকর।

 

By মাহিন ইকবাল কাজী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *