প্রায়শ্চিত্ত

“মা, আমার ভাল লাগছে না।আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে…।আমার জন্য আজ এই অবস্থা।আমি মরতে চাই।”- মৃত্যশয্যায় থাকা মায়ের সামনে এ কথা বলা ঠিক জেনেও অনিক এ কথাগুলো বলল। কারন তার মা-ও হয়ত আজ তাকে ঘৃণা করে। সে মাত্র কয়েকটা টাকার জন্য এমন এক ‘ভাইরাস’ সৃষ্টি করেছে যার কারনে মানবসভ্যতা আজ প্রায়্ ধ্বংসের মুখে। আর সবচেয়ে ভয়ানক খবর হল যে তার কন ‘এ্যানটিডোড’ নেই।সে যদি জানত যে এই ভাইরাস মানুষের ওপর প্রয়োগ করা হবে, তবে সে এটা বানাত না। এই ২৫২০ সালে সবচেয়ে বড় বিপদ এই ভাইরাস।পৃথ্বীবাসিদের সংখ্যা কমেছে পৃথিবীতে। গত ১০০ বছর আগে থেকেই বিভিন্ন প্রযুক্তির চোখ ধাধানো বিলাসিতায় মানুষ সত্যজ্ঞান হারায়।প্রযুক্তির ব্যবহার করতে করতে নিজ শরীরের ব্যবহারই ভুলে যেতে শুরু করে।স্থলুতার শিকার হয়ে প্রাণ হারাতে শুরু করে।আর তখন আসে ‘রোবট’।বসবাস শুরু করে মানুষের সাথে। বলাই বাহুল্য যে এদের মানুষই তৈরি করেছে।কিন্তু সময়ের স্রোতে মানুষের সৃষ্টি শুরু করেছে মানুষের নিয়ন্ত্রণ। সায়েন্স ডিপার্টমেন্টের চিফ প্রফেসর স্যার রোবোট ২১১বলেছিলেন –“আমরা পৃথিবীর কিছু প্রাণী নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করেছি। যেমন ধরুন, ‘বাঘ’ আর ‘সাপ’-এর জেনেটীক কোডিং করে ‘সাঘ’ তৈরি করেছি। কিন্তু এরা পোষ মানেনি ।এখন তাদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনা আসম্ভব। তাই এদের ধ্বংস করার জন্য আমার নিবেদন যে একটি ভাইরাস তৈরি করা হোক যার কোন আনটিডোড নেই।’’

অনিক বুঝতে পারেনি রবটের মানুষের অস্তিত্ব ছিনিয়ে নেবার চক্রান্ত।এখন সেই ভাইরাসে আক্রান্ত তার মা।

অনিক আবার বলল –“মা, আমি মরতে চাই”

অনিকের মা নির্বিকার হয়ে বলল-“তোর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কি??”

অনিক নিজের প্রতি ঘৃণায় মাথা নিচু করে কিছু না ভেবেই দোষী হয়ে বলল-“আমার জন্ম নেওয়াই তো সবচেয়ে বড় ভুল!!”

অনিকের মা ইশারা দিয়ে অনিককে কাছে টেনে জীবনের শেষ কথাগুলো বলে বিদায় নিল।

 

* * *

“হ্যাঁ,হবে আর একটু!”-অনিক নিজের ল্যাবরেটরিতে বলে উঠলো। মুহূর্তের মধ্যে এক বিস্ফোরণ ঘটল। অনিক হতাশায় ডুবে গেলো। এবারের চেষ্টাও সফল হলো না। গত দু-বছর যাবত ও ‘এ্যানটিডোড’ বানানোর চেষ্টা করছে।কিন্তু সফল হচ্ছে না।ও শুধু বেচে থাকার মত জমানো খাবার খেয়েই বেচে আছে। গত দু বছরে অনেক পালটে গেছে পৃথিবী। রোবটের রাজত্ব এসেছে। মানবসভ্যতা আজ প্রায়্ বিলীন।এই গোপন জায়গায় রোবটদের ফাঁকি দিয়ে থাকা খুবই দুষ্কর। অনিক আবার নানারকম সরঞ্জাম নিয়ে চেষ্টা করতে থাকল। ও হাল ছাড়বে না। কিছুতেই না। অনেক চেষ্টার পর ও পারল। সেই ওষুধ আবিষ্কারের ফর্মুলা। কিন্তু হায়!!ওর যে আরো নাইট্রোজেনের দরকার ছিল!!!

“রক্তের প্রাথমিক উপাদান অক্সিজেন,নাইট্রোজেন ও কারবন ডাই অক্সাইড”- কথাটা চট করেই ওর মাথায় এলো। রোবটের রাজত্ব, তাই আশেপাশে গাছ নেই। শুধু মানব খনিতে গাছ লাগায় বিলুপ্তপ্রায় মানুশেরা। অনিক দৌড়ে গিয়ে “অটোমেটিক এক্সপেরিমেন্টাল মেশিন” চালু করল। এখন থকে ১৫ মিনিটের পর শিডিউল অনুযায়ী ‘এ্যানটিডোড’ বানানো শুরু করবে মেশিনটি। তাড়াতাড়ি ও এক্তি যন্ত্রের পাশে ৩টি বিশাল কাচের সিলিন্ডার বসিয়ে যন্ত্রটির সাথে লাগিয়ে দিল। সিলিন্ডার তিনটায় লেবেল করা- অক্সিজেন,নাইট্রোজেন ও কারবন ডাই অক্সাইড…।আরও দ্রুত কাজ করতে থাকল ও। মানব খনির গুপ্ত নম্বরে ফোন দিয়ে বলল-“আমার কথা শুনুন। আমি ‘এ্যানটিডোড’ তৈরি করেছি। এখন থেকে ৪৭ মিনিটের মধ্যে রেদি হয়ে যাবে।লোকেশন ট্রাক করে ঠিকানায় আসুন। বেচে থাকা বাকি মানুষ বাঁচবে!!!” সাথে সাথে ফোন রেখে দিল। দৌড়ে গিয়ে একটা চেয়ারে বসল অনিক। “অটোমেটিক এক্সপেরিমেন্টাল মেশিন” আর ১০ মিনিটের মাথায় শুরু হবে। ৫ মিনিটের মধ্যে ওর শরীরের সব রক্ত চুষে নিবে চেয়ারে থাকা ইনজেকশন গুলি।রক্ত কে ৩টি প্রাথমিক পদার্থে ভেঙ্গে জরো করবে। নাইট্রোজেন এর ঘাটতি। তাই ওর রক্তের নাইট্রোজেন দিয়েই তৈরি হবে এ্যানটিডোড। অনিক আজ খুব খুশি। মেশিনে সুইচ টিপল ও।ইনজেকশন দিয়ে রক্ত নেওয়া শুরু হয়েছে।অনিকের ওর মায়ের শেষ কথা মনে পড়ল-

জন্ম যদি ভুল হয়,

তবে বেচে থাকা তার প্রায়শ্চিত্ত;

আর মৃত্য হলো তার মুক্তি……”

একটা শেষ হাসি দেখা গিয়েছিল অনিকের মুখে। আনন্দের হাসি। মুক্তির অবাধ হাসি। আজ সে মুক্ত। আজ শেষ হয়েছে তার প্রায়শ্চিত্ত।

By Oyshi Rahman

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *