স্বর্ণের জানা-অজানা রহস্য

“চকচক করলেই সোনা হয় না”— প্রচলিত এই প্রবাদটির সাথে আমরা কমবেশি সবাই পরিচিত। সোনার হিসাব কিংবা দরদাম নিয়ে আমাদের জানার আগ্রহেরও কোনো কমতি নেই। সোনা অত্যন্ত মূল্যবান একটি ধাতু হিসেবে আমাদের সবার কাছে প্রাচীনকাল থেকেই পরিগণিত হয়ে আসছে। তবে আমরা অনেকেই এর খুঁটিনাটি অনেক বিষয় সম্পর্কে জানি না। স্বর্ণ সংক্রান্ত এই রচনায় আমরা কথা বলবো স্বর্ণের ক্যারেট, রতি, ভরি কিংবা ওজনের বিষয়গুলো নিয়ে। এছাড়াও আমরা হলমার্ক ও স্বর্ণের বিস্কুট সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করবো। তাহলে আসুন জেনে নেয়া যাক স্বর্ণ সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু জ্ঞাতব্য।

 

আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য, বিনিময়ের সহজ মাধ্যম ও কাঠামোর স্থায়িত্বের কারণে স্বর্ণ বছরের পর বছর ধরে তুমুলভাবে জনপ্রিয় একটি ধাতু। একটা সময়ে স্বর্ণকে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করার ব্যাপক চল ছিল প্রাচ্যের দেশগুলোতে। এবার রাসায়নিকভাবে স্বর্ণের কিছু বৈশিষ্ট্য দেখে নেয়া যাক। স্বর্ণের রাসায়নিক প্রতীক হলো Au। আসলে এটি স্বর্ণের লাতিন প্রতিশব্দ “Aurum”- এর সংক্ষিপ্ত রূপ। স্বর্ণ পর্যায় সারণির গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান্তর ধাতু। স্বর্ণের পারমাণবিক সংখ্যা ৭৯। একটি পর্যায় সারণির একটি ডি-ব্লক মৌল এবং স্বর্ণের অবস্থান আমরা খুঁজে পাই গ্রুপ ১১-এর পর্যায় ৬-তে। রসায়নে স্বর্ণের বেশ কয়েকটি আইসোটোপ পাওয়া যায়।

 

স্বর্ণ অন্যান্য মৌলের মতো সহজে অন্য কারোও সাথে বিক্রিয়া করে না। স্বর্ণের গলনাঙ্ক ১৩৩৭.৩৩ কেলভিন অর্থাৎ ১০৬৪.১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা ১৯৪৭.৫২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। অপর দিকে স্বর্ণের স্ফুটনাঙ্ক ৩১২৯ কেলভিন অর্থাৎ ২৮৫৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস অথবা ৫১৭৩ ডিগ্রি ফারেনহাইট। স্বর্ণের ঘনত্ব হল প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে ১৯.৩০ গ্রাম।

 

জেনে রাখা ভালো যে, স্বর্ণ কিন্তু সরাসরিভাবে খনি থেকে পাওয়া যায় না। অন্যান্য অনেক ধাতু এবং অশুদ্ধির সাথে মিশ্রিত অবস্থায় খনি থেকে স্বর্ণ পাওয়া যায়। স্বর্ণ খনি থেকে উত্তোলন করা একটি ব্যয়বহুল ও পরিশ্রমসাধ্য কাজ। ইতিহাসবিদ ও দার্শনিকদের মতে স্বর্ণ হলো পৃথিবীতে মানুষের আবিষ্কৃত প্রাচীনতম ধাতু। বিশ্ববিখ্যাত জার্মান দার্শনিক কার্ল মার্কসও এই মত পোষণ করেছেন। ধারণা করা হয়, প্রায় ছয় হাজার খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথম স্বর্ণ আবিষ্কৃত হয়। পৃথিবীতে স্বর্ণের উত্তোলনযোগ্য পরিমাণ অত্যন্ত কম এবং এর বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক উৎপাদন অনেক কষ্টসাধ্য হওয়ায় স্বর্ণের বাজার মূল্য খুবই চড়া এবং এটিকে একটি মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে বিজ্ঞানীরা প্রমান করেছেন যে, সমুদ্রের তলদেশে প্রচুর পরিমাণ স্বর্ণ মজুত রয়েছে যা উত্তোলনযোগ্য নয়। মিশরের পিরামিডগুলির ভিতরেও প্রচুর স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া গেছে। এ থেকে সহজেই ধারণা করা যায় যে প্রাচীন মিশরে মূল্যবান ধাতু হিসেবে স্বর্ণের ব্যাপক ব্যবহার ছিল।

 

প্রাচীনকালে স্বর্ণের বিশুদ্ধিকরণ পদ্ধতি মানুষের জানা ছিল না। সেসময়ে “অ্যাজেক” নামে সোনা ও রূপার একটি সংকর ধাতু ব্যবহার করা হতো। এছাড়াও, প্রাকৃতিকভাবেই “ইলেকট্রাম” নামে সোনা ও রূপার একটি সংকর ধাতু পাওয়া যায়। হাজার হাজার বছর সময়ের পরিক্রমায় স্বর্ণ আজোও আমাদের সমাজে একটি অত্যন্ত মূল্যবান ধাতু হিসেবে টিকে আছে।

 

স্বর্ণ নিয়ে আমাদের কৌতূহলের কোনো শেষ নেই। তাই আর দেরি না করে আজকে আমরা জেনে নেবো যে স্বর্ণের “ক্যারেট” আসলে কী এবং এই “ক্যারেটের হিসাব” বলতে ঠিক কী বোঝায়।

 

ক্যারেট মূলত একটি একক যা স্বর্ণের বিশুদ্ধতা পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই ক্যারেটের মান যতো বেশি হয়, স্বর্ণের বিশুদ্ধতা ততোই বেশি হবে বলে মনে করা হয়। ক্যারেট শব্দটি সোনার বিষয়বস্তু ও বিশুদ্ধতা পরিমাপের জন্য গোটা বিশ্বে ব্যবহৃত হয়। নিম্নে বিভিন্ন প্রকার ক্যারেটের প্রকারভেদ তুলে ধরা হলো —

 

২৪ ক্যারেট স্বর্ণ:

২৪ ক্যারেট স্বর্ণকে বিশুদ্ধ স্বর্ণ বা ১০০ শতাংশ স্বর্ণ বলা হয়ে থাকে। চব্বিশ ক্যারেট হলো ক্যারেটের সর্বোচ্চ মান এবং এর চেয়ে অধিক শুদ্ধ কোনো স্বর্ণ হতে পারে না। এ ধরণের স্বর্ণ একটি স্বতন্ত্র উজ্জ্বল হলুদ রং ধারণ করে। ২৪ ক্যারেট স্বর্ণ সম্পূর্ণভাবে বিশুদ্ধ বলে এটির বাজারদর সবসময়েই অন্য যেকোনো প্রকার স্বর্ণের চেয়ে বেশি হয়। তবে এই ধরণের স্বর্ণের ঘনত্ব অন্য ক্যারেটের তুলনায় কিছুটা কম হওয়ায় এটি বেশ নরম ও নমনীয়। অতএব, এটি সাধারণ গহনা বানানোর জন্য উপযুক্ত নয়। স্বর্ণের কয়েন বা বার ২৪ ক্যারেটের বিশুদ্ধতাতেই কেনা হয়ে থাকে।২৪ ক্যারটের স্বর্ণ বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত কাজে সারাবিশ্বে ব্যবহৃত হয়।

 

২২ ক্যারেট স্বর্ণ:

২২ ক্যারেটের স্বর্ণ সাধারণত গহনা তৈরির কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।২২ ক্যারেট বলতে বোঝায় যে এতে স্বর্ণের সম্পূর্ণ ২৪ অংশের মধ্যে কেবল ২১ ভাগ রয়েছে এবং বাকি দুই ভাগের জন্য অন্য কোনো ধাতু ব্যবহার করা হয়েছে। অতএব, ২২ ক্যারেট স্বর্ণের ১০০ শতাংশের মধ্যে ৯১.৬৭ শতাংশ বিশুদ্ধ স্বর্ণ।বাকি ৮.৩৩ শতাংশে রৌপ্য, দস্তা, নিকেল কিংবা অন্যান্য সংকর ধাতু ব্যবহার করা হয়। এই ধাতুগুলি যোগ করার ফলে স্বর্ণের গঠনকে কঠিন করে দেওয়া হয় যাতে করে গহনা বেশি টেকসই হয়। তবে ২২ ক্যারেট স্বর্ণ হীরা ও ভারী জহরত খচিত গহনার জন্য ভালো নয়।

 

১৮ ক্যারেট স্বর্ণ:

১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ সাধারণত সবচেয়ে কম ব্যয়বহুল হয়ে থাকে। এই স্বর্ণের বিশুদ্ধতা মাত্র ৭৫ শতাংশ এবং এতে বাকি ২৫% তামা কিংবা রূপার মতো অন্য ধাতু ব্যবহার করা হয়। সাধারণত ভারি জহরত সমৃদ্ধ গহনা ১৮ ক্যারেট স্বর্ণের দ্বারা তৈরি করা হয়। এধরণের স্বর্ণের রং সামান্য অনুজ্জ্বল হয়, যার ফলে যে-কেউ ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ খুব সহজেই চিনতে পারে।

 

স্বর্ণের ক্যারেটের বিশুদ্ধতার বিভিন্ন মান নিচে দেয়া হল —

২৪ ক্যারেট = ১০০% বিশুদ্ধ স্বর্ণ

২২ ক্যারেট = ৯১.৭% স্বর্ণ

১৮ ক্যারেট = ৭৫% স্বর্ণ

১৪ ক্যারেট = ৫৮.৩% স্বর্ণ

১২ ক্যারেট = ৫০% স্বর্ণ

১০ ক্যারেট = ৪১.৭% স্বর্ণ

 

স্বর্ণের গহনা কেনার সময়ে আমাদের স্বর্ণের এই বিশুদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। স্বর্ণের গায়ে ২৪ ক্যারেটকে ১০০০ ধরে প্রতি ক্যারেট হিসেবে তার মান লেখা থাকে। যেমন ৯১৬ অর্থাৎ ২২ ক্যারেট,৮৭৫ অর্থাৎ ২১ ক্যারেট এবং ৭৫০ অর্থাৎ ১৮ ক্যারেট। স্বর্ণালঙ্কার ক্রয় করার সময়ে আমাদের সবারই এই বিষয়গুলো সতর্কতার সাথে খেয়াল করা উচিত।

 

স্বর্ণ সংক্রান্ত বিষয়ে আমরা এতক্ষণ আলোচনা করেছি স্বর্ণের রাসায়নিক দিক এবং ক্যারেটের হিসাব নিয়ে। এখন আমরা দেখে নেবো স্বর্ণের ওজনের কিছু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়ম এবং একক। প্রথমে দেখে নেয়া যাক স্বর্ণ পরিমাপের আন্তর্জাতিক এককগুলো—

 

১ ট্রয় আউন্স = ৪৮০ গ্রেইন

১ গ্রেইন = ৬৪.৭৯৮৯১ মিলিগ্রাম (প্রায়)

‍অতএব, ১ ট্রয় আউন্স = ৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম

 

আবার,

২৪ গ্রেইন = ১ পেনিওয়েট

২০ পেনিওয়েট = ১ ট্রয় আউন্স

১২ ট্রয় আউন্স = ১ ট্রয় পাউন্ড

 

এছাড়াও মেট্রিক পদ্ধতিতে রূপান্তর করলে,

১ ট্রয় আউন্স = ৩১.১০৩ গ্রাম (প্রায়)

১ পেনিওয়েট = ১.৫৫৫ গ্রাম (প্রায়)

১৫.৪৩২ গ্রেইন = ১ গ্রাম

১ গ্রেইন = ০.০৬৪৮ গ্রাম (প্রায়)

 

উল্লেখ্য, আমাদের “গ্রেইন” এবং “গ্রাম” এই দুইটি এককের মধ্যে পার্থক্য গুলিয়ে ফেললে চলবে না। এবার দেখে নেয়া যাক আমাদের বাংলাদেশে প্রচলিত স্বর্ণ ওজনের কিছু চিরাচরিত এককের বিষয়ে —

১ ভরি = ১৬ আনা

১ আনা = ৬ রতি

অতএব, ১ ভরি = ৯৬ রতি

 

এখন,

১ ভরি স্বর্ণকে ক্যারেটের হিসাবে প্রকাশ করতে চাইলে,যদি,

১ ভরি = ২৪ ক্যারেট

তাহলে, ১ ক্যারেট = ১/২৪ ভরি অর্থাৎ,৪ রতি।

 

আবার, আমাদের এই ভরি-রতির হিসাবকে মেট্রিক পদ্ধতিতে প্রকাশ করলে —

১ আউন্স = ২.৪৩০৫ ভরি

১ আউন্স = ২৮.৩৪৯৫ গ্রাম

১ ভরি = ০.৪১১৪৩ আউন্স

১ ভরি = ১১.৬৬৩৮ গ্রাম

 

তাহলে উপরের ছক অনুযায়ী একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লেই আমরা পুরো বিষয়টি খুব সহজেই বুঝতে পারবো। আজকাল মোটামুটি সব স্বর্ণালঙ্কারের দোকানেই স্বর্ণের খাদ মাপার মেশিন থাকে। এই মেশিনের নাম স্পেকট্রোমিটার। আমরা চাইলে খুব সহজেই এতে করে স্বর্ণের মান ও খাদ সম্পর্কে বিশদ ধারণা লাভ করতে পারি। এছাড়া স্বর্ণ কেনার সময়ে আমাদের অবশ্যই “হলমার্ক” চিহ্ন দেখে নিতে হবে। এই চিহ্নটি স্বর্ণের বিশুদ্ধতা এবং খাঁটি মানের বিষয়টি নির্দেশ করে।

 

চলুন এবার জেনে নেয়া যাক স্বর্ণ সম্পর্কে কিছু বিস্ময়কর তথ্য —

১/ মানুষের রক্তে প্রায় ০.২ মিলিগ্রাম স্বর্ণের উপস্থিতি রয়েছে।

২/ চকোলেটের মাধ্যমে স্বর্ণ আমাদের শরীরে ঢোকে।

৩/ রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় স্বর্ণের ব্যবহার করা হয়।

৪/ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ উৎপাদন করে গণচিন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ খনি রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়।

৫/ ভারতের নারীরা পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণ ব্যবহার করেন।

৬/ বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো সোনার বারের ওজন ২৫০ কেজি।

৭/ লেগো (LEGO) কোম্পানির কর্মচারীরা সেই প্রতিষ্ঠানে টানা পঁচিশ  বছর চাকরি করলে কর্তৃপক্ষ তাদের উপহারস্বরূপ ২৫ গ্রাম ওজনের স্বর্ণের টুকরো প্রদান করে।

৮/ ইউক্যালিপটাস গাছের পাতায় স্বর্ণের পাতলা স্তর আছে।

৯/ অলিম্পিক গেমসের স্বর্ণ পদকে মাত্র ১% স্বর্ণ আছে।

১০/ পৃথিবীর মহাসাগরগুলো থেকে সমস্ত স্বর্ণ উত্তোলন করা সম্ভব হলে বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে এক পাউন্ড করে স্বর্ণ বিতরণ করা সম্ভব হতো।

 

সুতরাং একথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, স্বর্ণ আমাদের কাছে অত্যন্ত পছন্দের একটি ধাতব বস্তু। আশা করি স্বর্ণ সংক্রান্ত এই আলোচনাটি সকলের উপকারে আসবে।

 

By অভিতোষ চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *