রহস্যে ঘেরা সূর্যগ্রহ

মানুষের কাছে সূর্যগ্রহণ সবসময়েই এক অপার বিস্ময়ের নাম। যুগ যুগ ধরে মানুষ সূর্যগ্রহণ দেখে কতোই না জল্পনা-কল্পনা করেছে! কৌতূহল ও বিস্ময়ের সেই তাড়না থেকেই মানুষ জানতে পেরেছে সূর্যগ্রহণের গ্রহণযোগ্য বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। কিন্তু আজও মানুষের ভেতর দানা বেঁধে আছে সূর্যগ্রহণ নিয়ে কিছু কুসংস্কার,অজানা কিছু আতঙ্ক। সূর্যগ্রহণ নিয়ে বেশ‌ কিছু পৌরাণিক গল্প আমরা অনেকেই শুনেছি। আসলেই কি সেগুলোর কোনো বিজ্ঞানসম্মত গ্রহণযোগ্যতা আছে? সূর্যগ্রহণ নামের এই মহাজাগতিক ঘটনাটি আদতে কী? চলুন দেখে নেয়া যাক।

সূর্যগ্রহণ কী?

আমরা প্রতিদিন সকালে সূর্যোদয় এবং সন্ধ্যায় সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে অভ্যস্ত।সূর্যগ্রহণও কিন্তু সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্তের মতো ঠিক এরকমই একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা। সূর্যের আলোতেই আমাদের পৃথিবীতে সারাটা দিন ঝলমল করে। সূর্যই আমাদের সমস্ত শক্তির একমাত্র উৎস। আমাদের পৃথিবী এই সূর্যকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরছে। আবার ঠিক একইভাবে, পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ চাঁদ পৃথিবীকে কেন্দ্র করে উপবৃত্তাকার পথে ঘুরছে। যখনই চাঁদ দিনের বেলায় পৃথিবী এবং সূর্যের মাঝখানে চলে আসে, অর্থাৎ চাঁদের কারণে সূর্যের আলো পৃথিবীতে এসে পৌঁছতে পারেনা; তখনই আমরা তাকে সূর্যগ্রহণ বলি।সূর্যগ্রহণের সময় চাঁদ আংশিক অথবা পূর্ণাঙ্গভাবে সূর্যকে ঢেকে দেয়,এর ফলে পৃথিবীবাসী কিছু সময়ের জন্য সূর্যকে দেখতে পায়না।

 

মোটা দাগে সূর্যগ্রহণকে চার ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। যেমন—

ক) পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ

খ) আংশিক বা খণ্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণ

গ) বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ

ঘ) হাইব্রিড সূর্যগ্রহণ

 

সূর্যগ্রহণ কীভাবে হয়?

সূর্যের ব্যাস চাঁদের প্রায় ৪০০ গুণ বড়ো। আবার পৃথিবী থেকে সূর্যের দূরত্বও চাঁদের তুলনায় প্রায় ৪০০ গুণ বেশি। তাই, পৃথিবী থেকে খালি চোখে চাঁদ এবং সূর্য উভয়কেই একই আকৃতির মনে হয়। আবার পৃথিবীর চারিদিকে চাঁদের কক্ষপথ যেহেতু উপবৃত্তাকার, তাই পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব সবসময় সমান থাকে না। তাই যখন পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব কম থাকে তখন চাঁদকে অনেক বড়ো মনে হয়। আবার,সূর্য যদি একই সময়ে তুলনামূলক বেশি দূরত্বে থাকে তবে তাকে আকৃতিতে ছোট মনে হয়।ঠিক এই জিনিসটাই হয় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে।যখন চাঁদ দিনের বেলায় কিছু সময়ের জন্য সূর্যকে পুরোপুরিভাবে ঢেকে দিতে পারে তখন তাকে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ বলে।এক্ষেত্রে সূর্য তুলনামূলক বেশি দূরত্বে থাকায় এবং চাঁদ তুলনামূলক কম দূরত্বে থাকায় সূর্য পূর্ণাঙ্গভাবে ঢেকে যায়।

আংশিক বা খণ্ডগ্রাস সূর্যগ্রহণের ক্ষেত্রে চাঁদ সূর্যের কিছু অংশ অথবা অর্ধেক অংশ ঢেকে ফেলতে সক্ষম হয়। অবশ্য সব ধরণের সূর্যগ্রহণই অংশিক গ্রহণের মাধ্যমেই শুরু হয়। আর যখন চাঁদ সূর্যকে প্রায় পুরোপুরিভাবেই ঢেকে দেয়,কিন্তু চাঁদের ছায়ার চারিদিকে একটি চুড়ির মত অগ্নিবলয়ের সৃষ্টি হয় তখন তাকে বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ বলে।আর যদি একইদিনে পৃথিবীর এক অংশে বলয়গ্রাস এবং আরেক অংশে পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়,তবে সেটাকে বলে হাইব্রিড সূর্যগ্রহণ। হাইব্রিড সূর্যগ্রহণ খুবই কম দেখা যায়।পৃথিবী চাঁদের তুলনায় বেশ অনেকখানি বড়ো হওয়ায় চাঁদের ছায়া একইসাথে একই সময়ে পৃথিবীর উপর সমগ্রভাবে পড়ে না। সেজন্য সূর্যগ্রহণ একই সময়ে একইসাথে পুরো পৃথিবী জুড়ে দেখা যায় না। তাছাড়া,পৃথিবীকে কেন্দ্র করে চাঁদের নিজস্ব গতির কারণে সূর্যগ্রহণ খুব বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে পারে না।

তাত্ত্বিকভাবে হিসাব করে দেখা গেছে,একটি সূর্যগ্রহণ সর্বোচ্চ ৭ মিনিট ৪০ সেকেন্ড স্থায়ী হতে পারে।এ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে দৃশ্যমান সূর্যগ্রহণগুলোর মধ্যে সবথেকে দীর্ঘস্থায়ী গ্রহণ সংঘটিত হয়েছিল ২০০৯ সালে,যেটির স্থায়িত্ব ছিল ৬ মিনিট ৩৮.৮৬ সেকেন্ড।আর আগামি ২১৬৮ সালের ৫ জুলাই পৃথিবীবাসী দেখতে চলেছে ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সূর্যগ্রহণ,যেটি প্রায় ৭ মিনিট ৩৬ সেকেন্ড সময়কাল ধরে দেখা যাবে। প্রতিবছর সর্বনিম্ন দুইটি থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি সূর্যগ্রহণ হয়ে থাকে। এরমধ্যে আবার সর্বোচ্চ দুইটি পূর্ণগ্রহণ হতে পারে। প্রতিবছর ২ থেকে ৫টি সূর্যগ্রহণ হলেও সবসময়ে সেগুলো আমাদের নজরে আসে না।এর কারণ হলো অনেক সূর্যগ্রহণই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্বতমালা,মহাসাগর প্রভৃতি জনবিরল অংশ থেকে দৃশ্যমান হয়ে থাকে।

আলোর উৎস একক একটি বিন্দু না হলে,ছায়া কয়েক ভাগে ভাগ হতে পারে। সূর্য যেহেতু আলোর একবিন্দু উৎস নয়,তাই পৃথিবীর উপর চাঁদের তিন প্রকারের ছায়া এসে পড়ে। এগুলোকে বলা হয়—প্রচ্ছায়া(Umbra),উপচ্ছায়া(Penumbra) এবং বিপরীত প্রচ্ছায়া(Antumbra)।যেকোনো টিউবলাইট জ্বালিয়ে মেঝেতে হাতের দ্বারা ছায়া সৃষ্টি করে হাতটি আস্তে আস্তে আলোর উৎসের দিকে নিয়ে গেলে ব্যাপারটি বুঝতে সুবিধা হবে। চাঁদের প্রচ্ছায়ার মধ্যে থাকা এলাকায় পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। অন্যদিকে উপচ্ছায়ার আওতায় থাকা অঞ্চলে আংশিক বা খণ্ডগ্রহণ দেখা যায়। এছাড়া,চাঁদের বিপরীত প্রচ্ছায়ার মধ্যে অবস্থানকারী ব্যক্তি মনোমুগ্ধকর বলয়গ্রাস সূর্যগ্রহণ অবলোকন করবেন।

 

সূর্যগ্রহণ চন্দ্রগ্রহণ:

আমরা সবাই জানি যে চাঁদের নিজস্ব কোনো আলো নেই।সূর্যের আলো চাঁদে গিয়ে প্রতিফলিত হয় এবং আমরা একটি চমৎকার জ্যোৎস্নারাত পাই।সূর্যগ্রহণের মতোই চন্দ্রগ্রহণও একটি সৌরজাগতিক ঘটনা।যখন পৃথিবী চাঁদ এবং সূর্যের মধ্যবর্তী স্থানে একই সরলরেখায় চলে আসে,তখন পৃথিবীর ছায়ার ফলে কিছু সময়ের জন্য চাঁদে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। এটাকেই আমরা চন্দ্রগ্রহণ বলি।চাঁদের তুলনায় পৃথিবীর ব্যাস অনেক বেশি হওয়ায় পৃথিবীর ওই ব্যাসের পথটুকু অতিক্রম করতে চাঁদের অনেকটা সময় লাগে। এইজন্য সূর্যগ্রহণের স্থায়িত্ব মাত্র কয়েক মিনিট হলেও চন্দ্রগ্রহণের স্থায়িত্ব দুই থেকে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে। মজার ব্যাপার হলো,চন্দ্রগ্রহণের চেয়ে সূর্যগ্রহণ সংখ্যায় বেশি হয়।কিন্তু অনেক সময়ে সেগুলো সমুদ্রপৃষ্ঠ বা পর্বতমালা থেকে দৃশ্যমান হওয়ায় আমাদের চোখে পড়ে না।

প্রাচীনকালের গবেষকরা হিসাব করে দেখেছিলেন যে, একটি সূর্যগ্রহণের ঠিক ১৮ বছর ১১ দিন ৮ ঘণ্টা পর আবার একই রকম একটি সূর্যগ্রহণ সংঘটিত হয়।এই ১৮ বছর ১১ দিনের সময়কালকে তাই নাম দেয়া হলো সারস চক্র। লাতিন “সারস” শব্দের অর্থ হলো পুনরাবৃত্তি। একটি সারস চক্রের মধ্যে সাধারণত ৭৫টি সূর্যগ্রহণ হয়ে থাকে।এই সারস চক্রের মাধ্যমে আগামি কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত সূর্যগ্রহণের হিসাব নিখুঁতভাবে বের করে ফেলা সম্ভব। অমাবস্যা কিংবা তার অব্যবহিত পরেই সূর্যগ্রহণ দেখা যায়। এখন প্রশ্ন হলো,তাহলে প্রতিটি অমাবস্যাতেই আমরা সূর্যগ্রহণ দেখতে পাইনা কেন? এর উত্তর হলো, চাঁদের কক্ষপথ এবং পৃথিবীর কক্ষপথ একই তলে অবস্থান করেনা। এছাড়া, পৃথিবীর উপবৃত্তাকার ঘূর্ণন পথ ৫ ডিগ্রির বেশি হেলে আছে চাঁদের ঘূর্ণন পথের সাথে।তাই অনেকসময়েই চাঁদ সূর্যের পাশ থেকে যাওয়ার সময়ে চাঁদের ছায়া পৃথিবীকে এড়িয়ে যায়।যদি পৃথিবী,চাঁদ আর সূর্য একই তলে,বৃত্তাকার কক্ষপথে থাকতো;তবে আমরা প্রতিমাসে সূর্যগ্রহণ দেখতে পেতাম।

 

সূর্যগ্রহণের বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব:

পৃথিবীর তাবৎ মহাকাশবিজ্ঞানীরা আগ্রহভরে সারা বছর অপেক্ষা করেন সূর্যগ্রহণের জন্য। কারণ,সূর্যগ্রহণের সময়েই দেখা যায় সূর্যের ছটামণ্ডল,আবহমণ্ডল,ক্রোমোস্ফিয়ার প্রভৃতি কৌতূহলোদ্দীপক অংশকে। এছাড়া,বিজ্ঞানের বহু গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ও বিভিন্ন তত্ত্ব ও সূত্রের প্রমাণ সূর্যগ্রহণের সময়েই পাওয়া গেছে। যেমন,সূর্যগ্রহণের সময়েই প্রথম হিলিয়াম আবিষ্কার হয় এবং আলোর উপর মহাকর্ষ বলের প্রভাবের সর্বজনসম্মত প্রমাণ পাওয়া যায়।এছাড়া,কোরোনোগ্রাফ যন্ত্রের সাহায্যে যে কোনো সময়ে কৃত্রিমভাবে সূর্যগ্রহণের ন্যায় অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়।

সূর্যগ্রহণকে ঘিরে প্রচলিত কুসংস্কার:

সূর্যগ্রহণকে ঘিরে আমাদের মধ্যে কিছু কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস রয়েছে। অনেকে সূর্যগ্রহণের সময়ে রান্না করেন না কিংবা খাদ্যগ্রহণ থেকে বিরত থাকেন। এছাড়া,সূর্যগ্রহণের সময়ে ঘরের বাইরে বেরোনো কিংবা ভ্রমণ থেকে বিরত থাকা বহুদিন ধরে চলে আসা একটি প্রথা।গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে সূর্যগ্রহণের সময়ে বাইরে বের হওয়া অশুভ এবং অনাগত সন্তানের জন্য অমঙ্গলকর বলে মনে করা হয়। কিন্তু এইসব বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

 

সূর্যগ্রহণের ফলে দিনের বেলায় হঠাৎ করে অন্ধকার ঘনিয়ে আসার কারণে প্রাকৃতিক পরিবেশে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। পাখিরা সন্ধ্যা হয়ে গেছে মনে করে বাসায় ফিরতে শুরু করে এবং কলরব করে।সূর্যগ্রহণের ১০ মিনিট আগে থেকে গ্রহণ শেষ হওয়ার ১০ মিনিট পর পর্যন্ত তাপমাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। বিশেষ করে বিভিন্ন পাথর,শিলা ও ধাতুতে এই পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়।সূর্যগ্রহণের সময়ে প্রাণীদের আচরণেও কিছু আকস্মিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এসময়ে ছায়ালহরীর সৃষ্টি হতে দেখা যায়। তবে খালি চোখে কখনোই সূর্যগ্রহণ দেখা উচিত নয়। এতে আমাদের চোখের রেটিনা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।রেটিনা যেহেতু ব্যথার প্রতি সংবেদনশীল নয়,তাই এটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া অনুভূত হয় না;কিন্তু এর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব আছে। এমনকি, খালি চোখে সূর্যগ্রহণ দেখলে স্থায়ী অন্ধত্বেরও ঝুঁকি আছে।বিভিন্ন স্থানে অনেক বিজ্ঞান বিষয়ক সংগঠন যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে সূর্যগ্রহণ দেখার আয়োজন করে থাকে।আমাদের উচিত পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে এই অপূর্ব সুন্দর সৌরজাগতিক আলোছায়ার খেলা উপভোগ করা।

 

 By অভিতোষ চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *