নিকোলা টেসলা : ম্যান অফ দা ফিউচার- ৩

নিকোলা টেসলার উদ্ভাবনী জীবন :

রেডিও ট্রান্সমিশন,ইন্ডাকশন মোটর,অল্টারনেটিং কারেন্ট আরও না জানি এমন কত আবিষ্কার, যা মানুষের জীবনে এক নতুন বিপ্লব এনে দিয়েছে । আর জীবনের মানকে অনেক এগিয়ে দিয়েছে।নিকোলাস টেসলার নামে সাতশরও বেশি আবিষ্কার রয়েছে। যা দিয়ে এই পৃথিবীকে উন্নতির রাস্তায় অগ্রসর করেছে । তাঁর এমন কিছু আবিষ্কার ছিল যা আসলেই অনেক আলাদা প্রকৃতির ছিল । সেই সব কাজ যদি তাকে শেষ করতে দেওয়া হতো তাহলে হয়তো আজকে আমরা এমন পৃথিবী দেখতাম যা আমরা সাইন্স ফিকশন মুভিতে দেখতে পাই । এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল –

ডেথ রে :

টেলিফোর্স নিকোলা টেসলার সবচেয়ে বড় আবিষ্কারগুলোর মধ্যে একটি । নিকোলাস টেসলা এমন একটি হাতিয়ারের উপরে কাজ করেছিলেন যা দেড়শ মেইল দূর থেকেই যে কোন বিমান বা সামুদ্রিক জাহাজকে ধ্বংস করে ফেলতে পারতো । তাঁর ৭৮ তম জন্মদিনে সে একটি পত্রিকাকে জানায় , সে কয়েক দিনের মধ্যেই অনেক ক্ষমতাশীল একটি হাতিয়ার নিয়ে মানুষের সামনে আসবে । আর সেই ক্ষমতাশীল হাতিয়ার ছিল ডেথ রে । এটা এমন একটি হাতিয়ার ছিল যা মার্কারি বা ভাটিয়ালস্কো একটি ভ্যাকিউম চেম্বারের মধ্যে সাউন্ড এর গতির থেকেও ৪৮ গুন বেশি দ্রুত  গতি বৃদ্ধি করবে । আর এত উচ্চ বেগ দিয়ে এটি ফায়ার করত যে , দেড়শ মাইল দূরে আকাশে যদি ১০ হাজার বিমান একসাথে থাকত তাও সেটি ধ্বংস করে ফেলতে পারতো । আর শুধু আকাশেই নয় মাটিতে বা নদীতেও সে শত্রুদের ধ্বংস করে ফেলতে পারতো । নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকাটি এর ক্ষমতার কথা বিবেচনা করে এই হাতিয়ারটিকে ডেথ রে নাম দিয়েছিল । কারণ এটি দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই হাজারো মানুষের মৃত্যু হত । কিন্তু টেসলা অন্য চিন্তার মানুষ ছিল । সে এই পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ দেখতে চেয়েছিল । সে চাইতো সব দেশের কাছেই যেন ডেথ রে থাকুক যাতে কোন দেশেই যেন অন্য দেশের সাথে বিবাদে বা যুদ্ধে লিপ্ত না হয়ে পড়ে কারণ এই হাতিয়ার নিয়ে যুদ্ধে নামার অর্থ নিশ্চিত মৃত্যু । কিন্তু সেনাবাহিনী তাঁর এই আবিষ্কারকে অবহেলা করে পারমাণবিক বোমা বানানোর প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন যার ফলস্বরূপ এর ফলাফল কত ভয়াবহ ছিল তাঁর সাক্ষী জাপান আজো বয়ে বেড়াচ্ছে ।

ভূমিকম্প মেশিন :

১৮৯৩ সালে নিউ ইয়র্কে টেসলার নামে আরো একটি আবিষ্কার প্রকাশিত হয়  । আর সেটা  ছিল স্টিম পাওয়ার মেকানিকাল অসিলেটর । যা কিনা অনেক গতিতে উপর নিচে কম্পিত হয়ে ইলেক্ট্রিসিটি উৎপন্ন করতো । কিন্তু পরবর্তীতে টেসলা জানায় তিনি তাঁর এই অসিলেটর দিয়ে পরীক্ষা – নিরীক্ষা করার সময় ভুল করে ভূমিকম্প সৃষ্টি করে ফেলেছিলেন । যার ফলে তাঁর ল্যাবে তখন ভয়াবহ পরিস্থিতি ও ল্যাবের মেঝেতে ফাটল দেখা দেয় । তাঁর সকল ডকুমেন্ট তখন ভুমিকম্পের জন্য শূন্যে উড়ছিল । সে এই যন্ত্রটি বন্ধ করার চেষ্টা করলে যন্ত্রটি সে কোনমতেই বন্ধ করতে পারছিলেন না যার ফলে এক প্রকার বাধ্য হয়েই সে মেশিনটি ভেঙ্গে ফেলেন এবং আর কখনই সে মেশিনটি পুনরায় তৈরি করতে চান নি কারণ এই মেশিনটি দিয়ে অনেক ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড করা যেত ।

ওয়্যারলেস ইলেক্ট্রিসিটি :

নিকোলাস টেসলা ১৯০১ সালে নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে তখনকার সময়ের সবচেয়ে বড় ইনভেস্টার জে পি মরগানের নিকট ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার তাঁর নতুন প্রজেক্টে ইনভেস্ট করার অনুরোধ করেন ।সে একটি টাওয়ার বানাচ্ছিল যার নাম ছিল ওয়ারডান ক্লিপ টাওয়ার । সে মরগানকে জানায় এই টাওয়ার রেডিও ট্রান্সমিশনের জন্য করা হবে । যাতে ডাটা একজায়গা থেকে আরেক জায়গায় পাঠানো যায়। কিন্তু সে এই টাওয়ারটি এর থেকে অনেক বড় কাজের জন্য বানাচ্ছিল । টেসলা চাচ্ছিল টাওয়ারটির মাধ্যমে ইলেক্ট্রিসিটি কোন ওয়্যার ছাড়াই ট্রান্সফার করতে। সে বাতাসের মাধ্যমে ইলেক্ট্রিসিটি ট্রান্সফার করতে চেয়েছিল;এর জন্য সে পুরো পৃথিবীকে একটি বড় কন্ডাকটর হিসেবে ব্যবহার করেছিল । যেখানে ইলেক্ট্রিসিটির প্রয়োজন হবে সেখানে এই লোহার রডটি পুতলেই হবে ।এই লক্ষ্যে সে অনেকদূর এগিয়ে গিয়েছিল এবং সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে ছিল। সে খুব সহজেই ইলেক্ট্রিসিটি ২ মাইল পর্যন্ত এই টাওয়ারের মাধ্যমে ট্রান্সফার করতে পারতো এবং পাশাপাশি এটি ব্যবহার করে সে হাজার মাইল পর্যন্তও ইলেক্ট্রিসিটি ট্রান্সফার করার সক্ষমতা প্রমাণ করেছিলেন । এই সেই বিপ্লবী আবিষ্কার ছিল যার মাধ্যমে সারা বিশ্ব আজ বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সেবা পেত কিন্তু প্রজেক্টটির ইনভেস্টর মরগানের ইলেক্ট্রিসিটি প্রডিউস কোম্পানি ছিল যা বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হত কারণ টেসলা এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ফ্রি ইলেক্ট্রিসিটি প্রডিউস করতে পারতো যার ফলে সারা পৃথিবী বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সেবা পেত এবং তাঁর ব্যবসার ভরাডুবি এক প্রকার নিশ্চিত ছিল তাই তিনি প্রজেক্টটির জন্য ফান্ড বন্ধ করে দেন । টাওয়ারটি সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই ১৯০৫ সালে টেসলা আর্থিক সঙ্কটের কারণে প্রজেক্টটি বন্ধ করতে বাধ্য হন । আর পরবর্তীতে নিজের লাভের জন্য জে পি মরগান ও থমাস এডিসনের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের কারণে প্রজেক্টটির জন্য নতুন করে এই প্রজেক্টটির জন্য অন্য কোন ইনভেস্টর অর্থ অনুদান করেন নি যার ফলে স্বপ্নভঙ্গ হয় চিরদিনের জন্য । আর যার ফলেই আজ সারা পৃথিবীতে  আমাদের অনেক তৃণমূল পর্যায়ের বিশ্বে অনেক জাতি এখনও বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ।

এয়ারশিপ্স :

টেসলা ছোটকাল থেকেই উড়ন্ত বস্তু বানানোর স্বপ্ন দেখতো । সে তাঁর সময়ের বৈজ্ঞানিক বা উদ্ভাবনকারীদের থেকে অনেক শতাব্দী এগিয়ে ছিলেন বলে মতবাদ করেন আজকের বৈজ্ঞানিকেরা । সে কোন কাজ শুরু করার পূর্বেই সেই কাজটির প্রত্যেকটি অংশের জন্য সুনিপুণভাবে পরিকল্পনা করতো ।যা আজকের বিজ্ঞানীরা সফটওয়ারের মাধ্যমে করে থাকে । তাঁর ইলেক্ট্রনিক ও মেকানিকাল বিদ্যার উপর যতটুকু দক্ষতা ছিল তাঁর উপর ভিত্তি করে সে অ্যাভিয়েশন এর একটি নতুন পদ্ধতি পৃথিবীর সামনে নিয়ে আসে । ১৯১৯ সালে একটি আর্টিকালে প্রকাশ করেছিলেন যে সে একটি সুপারসনিক এয়ারক্রাফট তৈরি করেছিলেন যা মাটি থেকে আট মাইল উপরে উড়তে পারে । তাঁর ধারনা ছিল কোন  জিনিসকে যদি ইলেক্ট্রিসিটির সর্বোচ্চ পরিমাণে সরবরাহ দেওয়া যায় তাহলে সেই বস্তুটি সর্বোচ্চ উচ্চতায় উড্ডয়ন করতে সম্ভব এই ধারণাকে ফিল্ড প্রকৌশল বলে  । এই ধারনার ফলে নিউইয়র্ক থেকে লন্ডন ৩৪৫৯ মাইলের দূরত্ব মাত্র ৩ ঘণ্টায় ভ্রমণ করা সম্ভব । আর এটার পাওয়ার সোর্স হিসেবে টেসলার তৈরী সেই টাওয়ারটি পাওয়ার ট্রান্সফার করতে পারতো ।

 

থট ক্যামেরা :

 

টেসলা এটি মানতেন যে আমরা যা চিন্তা করি সেটির প্রতিচ্ছবি বাস্তবে ছবির মাধ্যমে প্রদর্শন করা সম্ভব । ১৯২৩ সালে টেসলা একটি সাক্ষাৎকারে বলেন যে তিনি এটি পরীক্ষা করে দেখেছেন ১৮৯৩ সালে যে আমাদের ব্রেইনের চিন্তা হুবুহু নকল হয়ে আমাদের চোখের রেটিনা সেটির প্রতিচ্ছবি তৈরী  করে  । যা কিনা সঠিক অপারেটর দ্বারা ডিকোড করে একটি ছবিতে পরিণত করা যেতে পারে । আর যদি এমনটা করা হত তাহলে আমাদের কারো চিন্তাই বৃথা যেত না । আর কে কি চিন্তা করছে তাও জানা যেত যার ফলে আমাদের ব্রেইন একটি খোলা বই এর মত হয়ে যেত । কিন্তু তাঁর এই আবিষ্কারের পূর্বেই সে পরলোক গমন করেন । তাঁর এই ধারনার উপর ভিত্তি করেই এখন মাইন্ড রিডিং টেকনোলোজি কাজের পর্যালোচনা চলছে ।

এক পলকে তাঁর সব আবিষ্কারসমূহ :

টেসলার নামে ২৬টা দেশে প্রায় ৩০০ টি আবিষ্কারের পেটেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে কিছুতো উপরেই উল্লেখ করা হয়েছে। আরও কিছু আবিষ্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য –

  • এসি ইলেক্ট্রিসিটি
  • রেডিও
  • ইন্ডাকশন মোটর
  • টেসলা কয়েল
  • রিমোট,রোবোট এবং গাইডেড মিসাইল সিস্টেম
  • ভায়োলেট রে
  • টেলিফোর্স
  • নিওন ল্যাম্প
  • ওয়্যারলেস টেলিগ্রাফি
  • থ্রি ফেস ইলেকট্রিক পাওয়ার
  • টেসলা টুরবাইন
  • টেসলা ভাল্ভে
  • ভ্যাকিউম ভ্যারিয়েবল ক্যাপাসিটর
  • শ্যাডো গ্রাফ
  • ফ্রি এনার্জি
  • টেসলা এক্সপেরিমেন্টাল
  • বৈদ্যুতিক ঝাড়বাতি,
  • এক্স-রে মেশিনের যন্ত্রপাতি,
  • বাইফিলার কয়েল,
  • ব্লেড বিহীন টারবাইন
  • টেসলা কলুম্বাস
  • রেসোন্যনাস ইন্ডাঙ্কটিভ কাপ্লিং
  • পলিফেস সিস্টেম
  • রোটেটিং ম্যাগনেটিং ফিল্ড
  • প্লাস্মা গ্লোব
  • ৩০ ভায়োলেট র‍্যাপ
  • কার্বন বাটন ল্যাম্প
  • টেলিজিও ডায়নামিক্স
  • টেলিঅপারেশন
  • টোর্পেডো
  • ভিটোল

By মোঃ খুরশিদুল আলম শান্ত

তথ্যসুত্র :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *