ভিটামিন সি-এর আদ্যোপান্ত

ভিটামিনকে বাংলায় বলে ‘খাদ্যপ্রাণ’। খাদ্যপ্রাণ নামটা শুনেই বোঝা যায় যে ভিটামিন আসলে আমাদের দেহে ঠিক কতোটা গুরুত্বপূর্ণ। ভিটামিনের কিন্তু আরোও একটা উচ্চারণ আছে। সেটা হলো – “ভাইটামিন”।

যাইহোক, আজকের আলোচনার বিষয় হলো –  ভিটামিন সি। এই ভিটামিন সি – কে আমরা ‘L-Ascorbic Acid’ (এল – অ্যাসকরবিক অ্যাসিড) নামেও ডাকতে পারি। আসলে ভিটামিন সি হলো জলে দ্রবণীয় একটি ভিটামিন। তবে এই ভিটামিন কিন্তু আমাদের দেহে তৈরিও হতে পারে না আবার বেশিক্ষণ মজুদও থাকতে পারে না। তাই আমাদের সবারই নিয়মিত পরিমিত মাত্রায় ভিটামিন সি খাদ্যের মাধ্যমে গ্রহণ করতে হয়।

ভিটামিন সি-এর সবচেয়ে কার্যকরী ও দারুণ উৎস হলো যেকোনো টকজাতীয় ফল। এই ফলগুলোকে ইংরেজিতে বলে ‘Citrus Fruits’ (সাইট্রাস ফ্রুটস)। যেমন: কমলালেবু, বাতাবিলেবু, পাতিলেবু, আমড়া, জলপাই, আমলকী, কামরাঙ্গা, কদবেল ইত্যাদি। এছাড়া আমরা পেয়ারা, পেঁপে, আনারস কিংবা স্ট্রবেরির থেকেও প্রয়োজনীয় ভিটামিন সি পেতে পারি। সবুজ শাক সবজিতেও কিন্তু কিছুটা ভিটামিন সি পাওয়া যায়। তবে, তাপ প্রয়োগ করে রান্না করার ফলে শাক-সবজিতে থাকা ভিটামিন সি নষ্ট হয়ে যায়। তাই সেগুলো আমাদের খুব একটা কাজে আসেনা। অবাক করার মতো তথ্য হচ্ছে, সবথেকে বেশি ভিটামিন সি কিন্তু আমরা পেতে পারি কাঁচা মরিচ থেকে! কিন্তু সেজন্য আপনাকে একটি গোটা মরিচ চিবিয়ে খেতে হবে!

আমাদের ভিটামিন সি-এর গড়পড়তা দৈনিক চাহিদা হলো ৯০ থেকে ১০০ মিলিগ্রাম। তবে গর্ভবতী নারী এবং ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে সেটা বেড়ে দাঁড়ায় ১২০ থেকে ১৫০ মিলিগ্রামে। দৈনিক ভিটামিন সি-এর এইটুকু চাহিদা পূরণে শেষপাতে এক টুকরো পেয়ারা কিংবা দু’টুকরো কাঁচা টমেটোই যথেষ্ট।

এবার একটু নিজের গল্প বলি, কলেজে পড়ার সময় একদিন পড়ে গিয়ে আমার হাতে একটু কেটে যায়, হালকা ক্ষতের সৃষ্টি হয়।সাথেসাথেই কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত মেডিকেল রুমে গেলে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ওষুধ-পত্র লিখে দিলেন আর সুন্দরভাবে ব্যান্ডেজ করে দিলেন। সাথে হাতে ধরিয়ে দিলেন দুটো ‘সিভিট’ – ভিটামিন সি ট্যাবলেট। ব্যবস্থাপত্রেও ‘সিভিট’ লেখা আছে দেখে আমি ব্যাপারটা ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করতেই ডাক্তার বললেন, “ক্ষত দ্রুত নিরাময় করতেও ভিটামিন সি সাহায্য করে।”

শুধু কাটাছেঁড়া বা শল্যচিকিৎসার পরে দ্রুত ঘা শুকাতে নয়, ভিটামিন-সি কিন্তু মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও ভীষণভাবে কার্যকর। সাধারণ সর্দি-কাশি ঠেকাতে না পারলেও এর প্রকোপ কমাতে ভিটামিন সি-এর জুড়ি মেলা ভার। একইসাথে, ভিটামিন সি ত্বক এবং চুলের স্বাস্থ্যের জন্যেও সমানভাবে উপকারী।তাছাড়া দাঁত এবং মাড়ির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতেও ভিটামিন সি-এর গুরুত্ব অপরিসীম।

মানবদেহে ভিটামিন সি-এর অভাব ঘটলে ক্লান্তি এবং অবসাদ বোধ হতে পারে, শরীর দুর্বল বোধ হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এছাড়াও, ভিটামিন সি-এর অভাবের কারণে বিরক্তিভাব ও খিটখিটে মেজাজ দেখা দিতে পারে। দ্রুত ওজন কমে যাওয়া, গেঁটে ব্যথা ও পেশিতে ব্যথারও অন্যতম কারণ হতে পারে ভিটামিন সি-এর অভাব। ভিটামিন সি-এর অভাবে দাঁত ও মাড়ির স্বাস্থ্য ঠিক থাকেনা, এমনকি শরীরের বাসা বাঁধতে পারে স্কার্ভির মতো রোগও। মাড়ি থেকে রক্ত ঝড়া, দেহে কালশিটে দাগ পড়া কিংবা ত্বক ও চুল শুষ্ক হয়ে যাওয়ার কারণও হতে পারে ভিটামিন সি-এর ঘাটতি। সর্বোপরি, ভিটামিন সি এর অভাবে দেহের সার্বিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভেঙে পড়ে।

কোনকিছুরই যেমন অতিরিক্ত ভালো নয়, তেমনই দৈনন্দিন অতিরিক্ত মাত্রায় ভিটামিন সি গ্রহণও ঠিক না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে করে ডায়রিয়া, বমি ও অম্বল হতে পারে। অতিরিক্ত ভিটামিন সি গ্রহণ যেমন স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক কর্মতৎপরতাকে ব্যাহত করে, তেমনিই এর ফলে বৃক্কে পাথর পর্যন্ত হতে পারে। পরিশেষে বলাই যায়, ভিটামিন-সি মানবদেহের জন্য অপরিমেয় গুরুত্ব বহন করে।সুতরাং, আমাদের রোজকার খাদ্যতালিকায় কিন্তু ভিটামিন-সি রাখতেই হবে!

 

By অভিতোষ চক্রবর্তী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *